collected
ঢাকার তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের সিদ্ধান্তের পর প্রকল্পগুলোর ভাড়া, আয় এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ঢাকার হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা, বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি ও নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
তিন প্রকল্পে মোট ৬৪ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার মেট্রোরেল পথ নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে পাতাল ও উড়াল—দুই ধরনের পথই থাকবে। প্রকল্পগুলোর গড় কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা।
মেট্রোরেল আইন, ২০১৫ অনুযায়ী, জনগণকে স্বল্প ব্যয়ে দ্রুত ও উন্নত গণপরিবহনসেবা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে মেট্রোরেল পরিচালনার ব্যয় এবং জনগণের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনার কথা রয়েছে।
বর্তমানে উত্তরা-মতিঝিল পথে মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা এবং পুরো ২০ কিলোমিটার পথে ভাড়া ৯০ টাকা। একই দূরত্বে বাসের সরকার নির্ধারিত ভাড়া ৫০ টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মেট্রোরেল পরিচালনার বর্তমান আয়-ব্যয়ের হিসাবেও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উত্তরা-মতিঝিল পথে টিকিট বিক্রি থেকে অনিরীক্ষিত আয় ছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ আয় ছিল প্রায় ২৪৪ কোটি টাকা। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে আংশিকভাবে চালুর পর আয় হয়েছিল ২২ কোটির বেশি।
সব মিলিয়ে সর্বশেষ অর্থবছর পর্যন্ত যাত্রীভাড়া থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৬৬৬ কোটি টাকা। এর বাইরে দোকানভাড়া ও বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য খাত থেকে বছরে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় হয়।
ডিএমটিসিএল সূত্র অনুযায়ী, শুধু বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে গত অর্থবছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। মেট্রোরেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ের ব্যয়ও ভবিষ্যতে বাড়তে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
উত্তরা-কমলাপুর মেট্রোরেল নির্মাণে জাইকার কাছ থেকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। এই ঋণ সুদসহ আগামী ৩০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। চলতি বছরে এ ঋণের কিস্তি হিসেবে প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত কিস্তি হিসেবে ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধের হিসাব রয়েছে।
ডিএমটিসিএল কর্মকর্তাদের মতে, উত্তরা-মতিঝিল পথে বর্তমানে যে পরিমাণ আয় হচ্ছে, তা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা সম্ভব হবে না।
এদিকে, জাইকার ঋণে বাস্তবায়নাধীন নতুন দুটি প্রকল্পের জন্য প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে বলে ডিএমটিসিএল সূত্র জানিয়েছে। এসব ঋণ সুদসহ পরবর্তী ৪০ বছরে পরিশোধ করতে হবে। অন্য একটি মেট্রোরেল প্রকল্পের জন্য এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হচ্ছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তাদের দাবি, জাইকার ঋণের কিছু শর্তের কারণে জাপানি ঠিকাদাররা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা, দরপত্র প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
দরপত্রের কারিগরি শর্ত প্রতিযোগিতা সীমিত করছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে এমআরটি লাইন-১-এর পাতালপথ নির্মাণে ‘ওয়ান-পাস জয়েন্ট’ পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, প্রস্তাবিত ব্যয়কে তিনি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, দেশে ঋণের বোঝা থাকা অবস্থায় এ ধরনের বড় প্রকল্পের অতিরিক্ত ঋণ ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে ঢাকার যানজট ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও সরকারের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বিপুল ব্যয়ের এসব প্রকল্পে যাত্রীদের জন্য ভাড়া কত নির্ধারণ করা হবে এবং প্রকল্পের আয় দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও পরিচালন ব্যয়ের কতটা বহন করা সম্ভব হবে।