Collected
সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে বাড়তি গরমের পর এবার শীত নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী হচ্ছে এল নিনো। এর প্রভাবে বাংলাদেশের শীতের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে। তবে বৃষ্টি কম হলে বাড়তে পারে ঘন কুয়াশা।
এপ্রিল-মে মাসের তীব্র গরমে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসিন্দা ফরহাদ হোসেনকে হাতে গোনা কয়েক দিনই এসি চালাতে হয়েছিল। তাঁর কাছে এবারের গ্রীষ্ম তুলনামূলক সহনীয় মনে হলেও সেপ্টেম্বরে চিত্র বদলে যায়। মাসের অর্ধেকেরও বেশি দিন এসি চালাতে হয়েছে বলে জানান তিনি। অক্টোবরেও সেই গরমের অনুভূতি রয়ে গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হয়েছে যথাক্রমে ৮ ও ১৮ শতাংশ। একই সময়ে তাপমাত্রাও ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। অক্টোবরেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
তবে মাসের শেষ দিকে আবহাওয়ার চিত্রে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। দেশের উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় ভোরের দিকে কুয়াশা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দিনভর গরম, ভোরে তুলনামূলক শীতল বাতাস এবং কোথাও কোথাও কুয়াশার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে শীতের পথে এগোবে দেশ।
এ অবস্থায় বড় প্রশ্ন—এবারের শীত কি আগের মতো তীব্র হবে, নাকি চলমান উষ্ণতার ধারাবাহিকতায় শীত হবে তুলনামূলক কম ও কম স্থায়ী? আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে এ প্রশ্নের সঙ্গে উঠে এসেছে প্রশান্ত মহাসাগরের প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া এল নিনো।
এল নিনো কোনো ঝড় বা নির্দিষ্ট দিনের আবহাওয়ার ঘটনা নয়। প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলীয় চাপের বড় পরিবর্তনের ফল এটি। এল নিনোর সময় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জমে থাকা উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্ব অংশে ছড়িয়ে যায়। একই সঙ্গে বৃষ্টি ও বজ্রমেঘের প্রধান অঞ্চলও পূর্ব দিকে সরে যায়।
এর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বৈশ্বিক বায়ুপ্রবাহ, বায়ুচাপ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার বিন্যাসে পরিবর্তন আসে। তবে এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে একই রকম হয় না। বাংলাদেশের আবহাওয়ার ক্ষেত্রেও বঙ্গোপসাগর, মৌসুমি বায়ু, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রা এবং স্থানীয় বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)-র ৩ সেপ্টেম্বরের আপডেট অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সামনের মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। সেপ্টেম্বর-নভেম্বর ২০২৬ এবং ডিসেম্বর ২০২৬-ফেব্রুয়ারি ২০২৭—দুই সময়েই এল নিনো অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা প্রায় ১০০ শতাংশ বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এটি খুব শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এর প্রভাবে এবার বাংলাদেশের শীতের গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। তবে এর অর্থ শীত থাকবে না বা শৈত্যপ্রবাহ হবে না—এমন নয়।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদের মতে, বৃষ্টি কম হলে কুয়াশা বাড়তে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে দিনের তাপমাত্রা কমে ঠান্ডা অনুভূত হলেও রাতে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে।
অর্থাৎ এবার শীতের ধরন হতে পারে কিছুটা ভিন্ন। একদিকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা, অন্যদিকে ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেলায় ঠান্ডার অনুভূতি—দুই পরিস্থিতিই একই সময়ে দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো বাংলাদেশের শীতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে ঠিকই, তবে শুধু এল নিনোর ভিত্তিতে পুরো মৌসুমের আবহাওয়া নির্ধারণ করা যায় না। বঙ্গোপসাগর ও স্থানীয় বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতিও শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে—এবারের শীত বাংলাদেশকে কতটা কাঁপাবে।