collected
অভাবের সংসারে বেড়ে উঠেছে তারা। কারও বাবা নেই, কারও বাবা বিদেশে গিয়েও কাজ পাননি। কারও পরিবারের সম্বল সামান্য জমি, আবার কারও সংসার চলে মায়ের একার প্রচেষ্টায়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা থামায়নি তারা। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় চার শিক্ষার্থীই জিপিএ-৫ পেয়েছে।
ভালো ফলের পর তাদের চোখে এখন নতুন স্বপ্ন। কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। তবে উচ্চমাধ্যমিক ও পরবর্তী পর্যায়ের পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তাও রয়েছে তাদের পরিবারের।
স্কুলে একমাত্র জিপিএ-৫ সাদিকার
ফরিদপুর শহরের জোহরা বেগম উচ্চবিদ্যালয় থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় মাত্র একজন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। সে সাদিকা আক্তার। তার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়ার। তবে পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনার খরচ চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে সে।
সাদিকা ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুর এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকে। পাঁচ বছর আগে তার মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর মা মোহসিনা বেগম দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার চালিয়ে তাদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেন। বাবার কাছ থেকে পাওয়া সামান্য অর্থ এবং আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতায় দুই মেয়ের পড়াশোনা চালানো হচ্ছে।
সাদিকা জানায়, তার মা-ই তাকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তবে পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে উচ্চমাধ্যমিকে মানবিক বিভাগে পড়ার কথা ভাবছে সে।
সাদিকার মা মোহসিনা বেগম বলেন, মেয়ের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। সে জিপিএ-৫ পাওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম করেছে। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করা তার জন্য কঠিন।
জোহরা বেগম উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ওয়াহিদা খানম বলেন, এ বছর বিদ্যালয় থেকে সাদিকাই একমাত্র জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী। আর্থিক কারণে তার পড়াশোনা ব্যাহত হলে শিক্ষক ও অভিভাবক হিসেবে বিষয়টি উদ্বেগের।
অনলাইনে ফ্রি ক্লাস করে জিপিএ-৫ সানজিনার
অর্থের অভাবে নিয়মিত প্রাইভেট পড়তে পারেনি সানজিনা ইসলাম। তাই ইউটিউব থেকে বিভিন্ন বিষয়ের ফ্রি ক্লাস করে পড়াশোনা চালিয়েছে সে। স্কুলে নিয়মিত উপস্থিত থাকার পাশাপাশি কোনো বিষয়ে সমস্যা হলে শ্রেণিশিক্ষকের সহযোগিতা নিয়েছে।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার শাকের ফকিরপাড়ার রফিকুল ইসলামের মেয়ে সানজিনা গোয়ালন্দ শহীদ স্মৃতি সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল।
সানজিনার বাবা রফিকুল ইসলাম আগে হাটের ইজারাদারের আদায়কারী হিসেবে কাজ করতেন। পরে একটি ছোট দোকান শুরু করেন। প্রায় আট মাস আগে ধারদেনা করে সৌদি আরবে গেলেও এখনো সেখানে কাজ পাননি বলে পরিবার জানিয়েছে।
সানজিনার মা কুলসুম আক্তার বলেন, স্বামী বিদেশে গিয়ে আয় করতে পারলে পরিবারের আর্থিক সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ঋণের চাপ এবং দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সানজিনা জানায়, প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য না থাকায় বাবার রেখে যাওয়া ফোন ব্যবহার করে ইউটিউবে বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাস করত। তার ইচ্ছা গোয়ালন্দ সরকারি কামরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হওয়ার। তবে পড়াশোনার খরচ নিয়ে সে দুশ্চিন্তায় রয়েছে।
মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে চায় রুবাইয়া
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার তবারিপাড়া গ্রামের কৃষক মো. রাসেল হোসেন সরকার ও গৃহিণী ছালমা বেগমের মেয়ে মোছা. রুবাইয়া খাতুন রাকা। সে ধানগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
রুবাইয়ার পরিবারের সম্বল বলতে সামান্য কিছু জমি। সেই জমির ফসলের ওপর নির্ভর করেই সংসার চলে। এর পাশাপাশি দুই সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
রুবাইয়ার মা ছালমা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার মেয়ে পড়াশোনায় ভালো। এসএসসিতে ভালো ফল করলেও এখন কলেজে পড়াশোনার খরচ জোগানো নিয়ে পরিবারটি চিন্তায় রয়েছে।
রুবাইয়ার ইচ্ছা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে ভালো ফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। পড়াশোনা শেষ করে মা-বাবার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কষ্ট কমাতে চায় সে।
রুবাইয়ার বাবা রাসেল হোসেন সরকার বলেন, সামান্য জমি চাষ করে সংসার চালানোই কঠিন। এর মধ্যে ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য।
ধানগড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোনাতন কুমার বলেন, রুবাইয়ার মতো মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে সহায়তা নিয়ে কেউ দাঁড়াবেন বলে তারা আশা করছেন।
বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে চায় সুমাইয়া
শেরপুর সদর উপজেলার ফটিকমারী গ্রামের সুমাইয়া আক্তার সুমী এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তার বাবা তোফাজ্জল হোসেনের স্বপ্ন ছিল সন্তানদের মধ্যে কেউ একজন চিকিৎসক হবে। তবে সুমাইয়া ছোট থাকতেই অসুস্থ হয়ে মারা যান তিনি।
সুমাইয়া হালগড়া ফটিয়ামারী উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। পরিবারের ৬ শতাংশ জমি ছাড়া তাদের আর কোনো আবাদি জমি নেই।
বাবার চিকিৎসার সময় পরিবারটি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পরে সুমাইয়ার মা শাহিনা বেগম বাবার কাছ থেকে পাওয়া ওয়ারিশি জমি বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেন এবং অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
সুমাইয়ার দুই বড় ভাই টিউশনি করে নিজেদের পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের খরচেও সহযোগিতা করেন। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেও সুমাইয়ার পড়াশোনা থেমে থাকেনি।
সুমাইয়া বলে, তার বাবার স্বপ্ন ছিল সন্তানদের মধ্যে কেউ একজন চিকিৎসক হবে। সে চিকিৎসক হয়ে বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। তবে উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে চালাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে সে।
সুমাইয়ার মা শাহিনা বেগমও মেয়ের উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হালগড়া ফটিয়ামারী উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক এ এইচ মুরাদ বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সুমাইয়া ও তার ভাই-বোনেরা পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। তার মতে, সুমাইয়া মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেলে ভালো করতে পারবে।
চার শিক্ষার্থীর পরিবারই জানিয়েছে, মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা এসএসসিতে ভালো ফল করেছে। এখন তাদের সামনে উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার নতুন পথ। তবে আর্থিক সংকটের কারণে সেই পথ কতটা নির্বিঘ্ন হবে, তা নিয়ে পরিবারগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।