collected
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। ইংরেজিতে যার মূল বক্তব্য ‘The Age of Longevity: Rethinking Systems for Longer Life’। প্রতিপাদ্যটি মূলত দীর্ঘায়ু পাওয়া মানুষের জীবনকে কীভাবে আরও সক্রিয়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বস্তিদায়ক করা যায়, সেই প্রশ্ন সামনে আনে। বাংলাদেশেও বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দেশের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে প্রবীণ বয়সে পৌঁছেছেন। প্রায় দুই কোটি প্রবীণ মানুষের প্রয়োজন পূরণে শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়। প্রবীণদের জন্য সরকারি ভাতা, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অন্যান্য সহায়তা প্রয়োজনীয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
বার্ধক্যের প্রস্তুতি বলতে সাধারণত অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অবসর জীবনে অর্থ, বাড়ি কিংবা পরিবারের সহায়তা থাকবে কি না—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে শুধু অর্থনৈতিক সক্ষমতা দীর্ঘ ও স্বস্তিদায়ক জীবন নিশ্চিত করতে পারে না। সুস্বাস্থ্য, মানসিক শান্তি, সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক সম্পর্ক, নিরাপদ বাসস্থান, চিকিৎসা সুবিধা এবং নিজের প্রতি সম্মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বার্ধক্যকে জীবনের শেষ অধ্যায় হিসেবে না দেখে দীর্ঘ জীবনযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একজন প্রবীণের কাছে শুধু বয়স নয়, রয়েছে দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, স্মৃতি ও অর্জন। তাই তাদের সামাজিকভাবে সক্রিয় রাখা এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করাও সমাজের দায়িত্ব।
তবে সক্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ বার্ধক্যের প্রস্তুতি ষাট বছর বয়সে গিয়ে শুরু করা সম্ভব নয়। এর ভিত্তি তৈরি হয় জীবনের শুরু থেকেই। শিশুকাল থেকে পুষ্টি, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিরাপদ পরিবেশ ও মানসিক বিকাশ পরবর্তী জীবনের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে। কর্মজীবনে নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্য, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন, সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং আর্থিক পরিকল্পনাকে জীবনের অভ্যাসে পরিণত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় প্রবীণদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আবাসন, চিকিৎসা, ওষুধ ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে গেলে রাষ্ট্র ও অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব কমে যায় না; বরং সামাজিক নিরাপত্তা, প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, আইনগত সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা আরও পরিকল্পিতভাবে নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার ও ব্যক্তিকেও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।
পরিবার প্রবীণের প্রথম আশ্রয় হলেও পরিবর্তিত জীবনযাত্রায় অনেক প্রবীণ একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হন। তাই শুধু খাবার বা ওষুধের ব্যবস্থা করাই যথেষ্ট নয়। তাদের সঙ্গে কথা বলা, মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, পারিবারিক সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত করা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও প্রয়োজন।
দীর্ঘ জীবন একদিকে মানবজীবনের বড় অর্জন, অন্যদিকে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তাই লক্ষ্য শুধু আয়ু বাড়ানো নয়; সুস্থায়ু, কর্মময়তা, মর্যাদা ও স্বস্তির জীবন নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের নীতি, পরিবারের যত্ন, সমাজের সহযোগিতা এবং ব্যক্তির নিজস্ব প্রস্তুতি—এই চারটি স্তরের সমন্বয়েই প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ২০২৬ তাই শুধু প্রবীণদের নিয়ে ভাবার দিন নয়; এটি প্রত্যেক মানুষকে নিজের ভবিষ্যৎ বার্ধক্য নিয়ে ভাবার সুযোগ তৈরি করে। আজকের শিশু, কিশোর ও তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। ফলে বার্ধক্যের প্রস্তুতি মূলত সুন্দর ও নিরাপদ জীবনের প্রস্তুতিই।