collected
আজ ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘দ্য এজ অব লংজিভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’—বাংলায় ‘দীর্ঘ জীবনের জন্য নতুন ভাবনা’। দীর্ঘায়ু মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও যত্নব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯ জন, যা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং ২০০১ সালে ছিল ৬ দশমিক ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যার কাঠামোয় প্রবীণদের অংশ ক্রমেই বাড়ছে।
প্রবীণদের জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, সামগ্রিক জীবনযাত্রার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে বয়স্কভাতা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্যতম অংশ। রাষ্ট্রপতির দেওয়া বাণীতে জানানো হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা খাতে ৫ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং সুবিধাভোগীর সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা, আবাসন ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রবীণদের বাস্তব জীবনের নানা সমস্যাও সামনে এসেছে। সাবেক বিসিক মহাব্যবস্থাপক মঞ্জু আরা বেগমের অভিযোগ, সম্প্রতি আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনে প্রবীণ নাগরিক হিসেবে ভাড়ায় ছাড় পাওয়ার বিষয়ে তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি। মেট্রোরেলের ভাড়ায় প্রবীণ নাগরিকদের ২৫ শতাংশ ছাড়ের ব্যবস্থা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি প্রবীণবান্ধব সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাস্তব প্রয়োগের গুরুত্ব সামনে আনে।
স্বাস্থ্যব্যয়ও অনেক প্রবীণের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মঞ্জু আরা বেগম জানিয়েছেন, তাঁর নিজের ওষুধে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং তাঁর স্বামীর জন্য আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রবীণদের জন্য নিয়মিত চিকিৎসা ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এ বাস্তবতায় প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি যত্নের ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এর পাশাপাশি নিঃসঙ্গতাও প্রবীণদের জীবনের একটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে। যৌথ পরিবারব্যবস্থা দুর্বল হওয়া, সন্তানদের কর্মব্যস্ততা এবং পরিবারের সদস্যদের আলাদা বসবাসের কারণে অনেক প্রবীণ একাকিত্বের মধ্যে পড়ছেন। অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রবীণদের মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, পরিবার দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রবীণদের জন্য কাজ করা সামাজিক সংগঠন ও বেসরকারি উদ্যোগের পরিধি আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি মত দিয়েছেন।
নিরাপদ আবাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ রিটায়ারমেন্ট হোমসের মতো উদ্যোগে প্রবীণদের আবাসন, চিকিৎসা ও সামাজিক পরিবেশের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে দেশে এ ধরনের নিরাপদ ও প্রবীণবান্ধব আবাসনের সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে ভবিষ্যতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আরও বাড়লে আবাসন ও দীর্ঘমেয়াদি যত্নের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে।
আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দেওয়া বাণীতে বয়স্কভাতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ‘ফ্যামিলি কার্ড’, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী শক্তিশালী করার উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নতুন সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করছে। বয়স্কভাতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও নিরাপদ যাতায়াত, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, দীর্ঘমেয়াদি যত্ন, উপযুক্ত আবাসন, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং পারিবারিক মর্যাদার বিষয়গুলোও সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস তাই শুধু প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর উপলক্ষ নয়; দীর্ঘায়ু মানুষের জন্য পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সেবাব্যবস্থা কীভাবে আরও উপযোগী করা যায়, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগও তৈরি করে।