বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখল

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:০৭ PM BST ২৫ বার পঠিত
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখল

collected

মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমলেও এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকি পুরোপুরি কেটে না যাওয়ায় অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০২৬ প্রান্তিকের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। তিনি জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) হার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) হার ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নিয়ন্ত্রণে এসেছে—এমন যথেষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থাকলেও আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০২ শতাংশে নামলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে রয়েছে। এর পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানির দাম, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য অস্থিরতা, দেশে জ্বালানির নিয়ন্ত্রিত মূল্যের সমন্বয় এবং নতুন বেতন কাঠামোর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও নানা চাপে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রাক্কলন করা হয়েছে। একই অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ওই সময়ে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। উচ্চ সুদে অর্থায়ন, জ্বালানি সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশি-বিদেশি চাহিদার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে বিভিন্ন খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কথা জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মধ্যে বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির, ছোট ও মাঝারি শিল্প এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে সরবরাহসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ এখনো দুর্বল রয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের চাপও অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। ২০২৬ সালের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংক পুনর্গঠন, সুশাসন, মূলধন পুনরুদ্ধার ও ঋণ শৃঙ্খলা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি থাকলেও নতুন অর্থবছরের শুরুতে চাপ তৈরি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্যালান্স অব পেমেন্টসের উদ্বৃত্ত ছিল ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, রেমিট্যান্স বৃদ্ধি ও তুলনামূলক স্থিতিশীল বিনিময় হার বৈদেশিক খাত ও আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়েছে।

আগামী অর্থবছরে দ্রুত নয়, বরং ধীরগতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হতে পারে বলে ধারণা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্ন, জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্য, বৈশ্বিক মুদ্রানীতি, অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, রাজস্ব খাতের চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া ব্যাহত না করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করাই এখন মুদ্রানীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। মূল্য স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বজায় রেখে টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সহায়তা করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: