collected
বাংলাদেশ থেকে গত কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। ৪৮টি দেশে যাওয়া ৪২ হাজারের বেশি নারী শ্রমিকের ৯০ শতাংশের বেশি সৌদি আরব ও জর্দানে গেছেন। একই সঙ্গে নতুন শ্রমবাজার হিসেবে জাপান, ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশেও নারী শ্রমিক যাচ্ছেন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। তাদের বড় একটি অংশ শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন। ২০২১ সাল থেকে পাঁচ বছরে ৪১২ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে ৮৪ জনের মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর এক গবেষণায় বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ৯৪ শতাংশ নারী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ৪৭ শতাংশ যৌন হয়রানির কথা বলেছেন। এ ছাড়া ৯৭ শতাংশ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন এবং একই হারে নারী সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। ৮২ শতাংশ নারীকে ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সীমা জহুর বলেন, নারী শ্রমিকরা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। তার ভাষ্য, দালালদের প্রলোভনে বিদেশে গিয়ে অনেক নারী প্রতিশ্রুত কাজ, বেতন ও কর্মপরিবেশ পান না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন, বিদেশ যাওয়ার আগে নারী শ্রমিকদের ভাষা, কাজের দক্ষতা এবং গন্তব্য দেশের আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে তাদের গৃহকর্মের পাশাপাশি নার্সিং ও পরিচর্যার মতো পেশায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, চাকরির চুক্তিপত্র ও নিয়োগকর্তা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় অনেক নারী গন্তব্য দেশে গিয়ে সমস্যার মুখোমুখি হন। তাদের বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, মজুরি বঞ্চনা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং গৃহবন্দি করে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
সংসদে দেওয়া তথ্যে জানা গেছে, আট বছরে প্রায় ৮০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে ফিরেছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিবছর প্রায় ১০০ নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে।
এদিকে সংসদে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিন লাখের বেশি নারী কর্মীর বিদেশ যাওয়ার তথ্য তুলে ধরে তাদের নিরাপত্তাহীনতা, মজুরি বঞ্চনা ও চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় ২৪ ঘণ্টার হটলাইন, সেফ হোম, বীমা সুবিধা এবং বিদেশি নিয়োগকর্তার তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানান তিনি।
জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর বলেন, বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৬১৩৫ নম্বরে টোল-ফ্রি হটলাইন চালু রয়েছে এবং বিদেশ থেকেও কর্মীরা সেখানে অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং দূতাবাসগুলো সহায়তা করে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ হাজার ২১৪ জন বা প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি নারী কর্মী বিদেশে গেছেন।