collected
রাজধানীর চারটি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। হাসপাতালগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ওই চার হাসপাতালে মোট ৮১৭ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী রোগী ছিলেন ৩১৬ জন। অর্থাৎ ৫০১ জন বা প্রায় ৬১ শতাংশ রোগীর হিসাব কম দেখানো হয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাব পর্যালোচনা করে এ পার্থক্য পাওয়া গেছে।
মুগদা হাসপাতালে সবচেয়ে বড় গরমিল
মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সোমবার ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে মোট ২২১ জন রোগী গণনা করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ২২৩ জন।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের প্রকাশিত তথ্যে মুগদা হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি দেখানো হয় ৪৯ জন। হাসপাতালের হিসাবের তুলনায় এ সংখ্যা ১৭৪ জন কম।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মোট ৪ হাজার ১৯৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে রোগী ভর্তি দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৭৭৩ জন। এ ক্ষেত্রেও ২ হাজার ৪২৬ জনের পার্থক্য রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেলেও তথ্যের পার্থক্য
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের কয়েকটি ওয়ার্ডে সোমবার সরেজমিনে ১২৮ জন ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যায়। হাসপাতালের পরিচালকের দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিন হাসপাতালে মোট ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে শিশু ছিল ৩১ জন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন ১০৫ জন। অর্থাৎ হাসপাতালের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে ৯৫ জনের পার্থক্য রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেলে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৩৯৯ জন। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ সংখ্যা ২ হাজার ১২৭ জন। এখানে গরমিল ২৭২ জনের।
সোহরাওয়ার্দী ও শিশু হাসপাতালেও একই চিত্র
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সেখানে ২৪২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে রোগী ছিলেন ১৫৪ জন। অর্থাৎ ৮৮ জনের পার্থক্য রয়েছে।
চলতি বছরে হাসপাতালটিতে মোট ৩ হাজার ৬৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বিপরীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ সংখ্যা ২ হাজার ৮৯৬ জন। এখানে পার্থক্য ৭৪২ জন।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকের দপ্তরের হিসাবে সোমবার হাসপাতালে ১৫২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের হিসাবে রোগী ছিলেন মাত্র ৮ জন। অর্থাৎ ১৪৪ জনের পার্থক্য পাওয়া গেছে।
হাসপাতালটির তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪৩২ জন শিশু ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ সংখ্যা ২৪২ জন। দুই পক্ষের হিসাবে পার্থক্য ১৯০ জন।
তথ্য নিয়ে প্রশ্ন
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম নিয়মিতভাবে ঢাকা মহানগরের ৭৭টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল এবং দেশের ৬৪ জেলার সরকারি ও কিছু বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গুর তথ্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করে। এসব তথ্য গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকেরাও ব্যবহার করেন।
তবে রাজধানীর সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে নিয়মিত আসে না। একইভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকার সব বেসরকারি হাসপাতাল এবং ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের তথ্যও এই পরিসংখ্যানে থাকে না। ফলে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইসমত আরা বলেন, হাসপাতালগুলো থেকে যে পরিসংখ্যান পাঠানো হয়, তার ভিত্তিতেই তথ্য প্রকাশ করা হয়। ভুল পরিসংখ্যান প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু রোগীর তথ্য কম দেখানো বা তথ্যে গরমিল থাকা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তার মতে, সঠিক তথ্য না থাকলে ডেঙ্গুর প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা এবং কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
২৪ ঘণ্টায় আরও ১ হাজার ৬৫৫ রোগী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রোববার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন করে ১ হাজার ৬৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয়জন।
চলতি বছরে এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৬৩ হাজার ৬২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ১৯০ জনের।