collected
বিশেষ প্রতিনিধি ॥ সামাজিক ব্যবসা, তরুণদের সম্ভাবনা এবং প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নিট কার্বন নিঃসরণমুক্ত একটি পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনের ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে বক্তব্য দেন তিনি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ব্যবসা, তরুণ নেতৃত্ব ও মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করা।
কূটনীতিতে শব্দের স্পষ্টতার ওপর গুরুত্ব
অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বর্তমান কূটনীতিতে অনেক শব্দের প্রকৃত অর্থ ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধ ও শান্তির মতো মৌলিক বিষয় নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, জাতিসংঘের এবারের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ও ধারণার প্রকৃত অর্থ ও স্পষ্টতা পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে।
সামাজিক ব্যবসা ও ক্ষুদ্রঋণের প্রসঙ্গ
ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ক্ষুদ্রঋণের ধারণা শুধু উন্নয়নশীল দেশেই নয়, উন্নত বিশ্বের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনেও পরিবর্তন আনতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জানান, ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে ৫০০ ডলারের ঋণসীমা নিয়ে শুরু হওয়া এ কার্যক্রমের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ।
সামাজিক ব্যবসা সম্পর্কে তিনি বলেন, মুনাফা অর্জনের পাশাপাশি মানুষের সমস্যা সমাধান ও অন্যের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যেও বড় ধরনের তৃপ্তি রয়েছে। এ ধরনের ব্যবসায় মুনাফা সর্বাধিক করার পরিবর্তে সামাজিক সমস্যা সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার
বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন অধ্যাপক ইউনূস। তিনি জানান, এ মডেলের আওতায় বর্তমানে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।
প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ দূর থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া চক্ষু চিকিৎসার জন্য গড়ে ওঠা একটি হাসপাতাল নেটওয়ার্কের কথা উল্লেখ করে ইউনূস বলেন, এর উদ্বৃত্ত আয় ব্যবহার করে নতুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান
তরুণদের বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক সময় তরুণদের চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলে। তার মতে, মানুষ স্বভাবগতভাবেই উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা রাখে।
এই ধারণাকে সামনে রেখে আগামী ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ কার্যক্রম শুরু করার কথা জানান তিনি। তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে তাদের যুক্ত করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমানও অনুষ্ঠানে তরুণদের অংশগ্রহণ থেকে নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। জাতিসংঘের প্রকাশিত বক্তব্যে তিনি তরুণদের নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ, উদ্যোগ তৈরি এবং বাস্তব পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
‘তিন শূন্যের পৃথিবী’র লক্ষ্য
অধ্যাপক ইউনূস ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ ধারণার কথা তুলে ধরেন—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য নিট কার্বন নিঃসরণ।
তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসা, প্রযুক্তি ও তরুণদের সম্মিলিত শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনের আলোচনায় সামাজিক ব্যবসা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, তরুণ নেতৃত্ব এবং মানবকেন্দ্রিক প্রযুক্তিকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাব্য উপায় হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা, ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।