এআইয়ের ছোঁয়ায় ভারতে চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ কমছে ৩০ শতাংশ

Pinky Saha Pinky Saha ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:৫৯ PM BST ২৪ বার পঠিত
এআইয়ের ছোঁয়ায় ভারতে চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ কমছে ৩০ শতাংশ

সংগৃহীত ছবি

কানাডার বরফাবৃত সুবিশাল পর্বতমালা কিংবা ১৯৩০ সালের বুদাপেস্ট শহরের ব্যস্ত পথঘাট—চিত্রনাট্যে এমন দৃশ্য থাকলেও বাস্তবে সেখানে গিয়ে শুটিং করা অনেক নির্মাতার জন্য কঠিন। বিশেষ করে সীমিত বাজেটের চলচ্চিত্রে বিদেশে শুটিংয়ের খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কয়েক বছর আগেও এমন পরিস্থিতিতে নির্মাতাদের হয় গল্পের দৃশ্য পরিবর্তন করতে হতো, নয়তো বিপুল অর্থ ব্যয় করে কৃত্রিম সেট ও ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তৈরি করতে হতো। এখন সেই জায়গায় দ্রুত প্রবেশ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।

ভারতের চলচ্চিত্রশিল্পে এআইয়ের ব্যবহার এরই মধ্যে নির্মাণ ব্যয় ও সময় কমাতে ভূমিকা রাখছে। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তিটির ব্যবহারে কিছু ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র নির্মাণের খরচ অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসছে। একই সঙ্গে শুটিংয়ের সময়ও বাঁচছে।

এর একটি উদাহরণ দিয়েছেন প্রযোজক আরফি লাম্বা। সম্প্রতি মুম্বাইয়ের একটি স্টুডিওতে বসেই এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইতালির আল্পস পর্বতমালার একটি সাধারণ দৃশ্যকে কানাডার তুষারাবৃত পাহাড়ি অঞ্চলের দৃশ্যে রূপান্তর করেছেন তিনি। অর্থাৎ নির্দিষ্ট লোকেশনে পুরো ইউনিট নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে প্রযুক্তির সাহায্যে দৃশ্যের পরিবেশ পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে।

আরফি লাম্বার দেওয়া আরেকটি উদাহরণ আরও বেশি খরচের পার্থক্য তুলে ধরে। বুদাপেস্টের একটি সেটকে ১৯৩০ সালের সময়কালের উপযোগী পুরোনো রূপ দিতে সাধারণ ভিএফএক্স টিম ব্যবহার করলে খরচ হতে পারত ১৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার ইউরো। কিন্তু এআই প্রযুক্তির সাহায্যে একই ধরনের কাজ প্রায় ১ হাজার ৫০০ ইউরোর মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।

চলচ্চিত্র প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। চিত্রনাট্যের ভুলত্রুটি শনাক্ত করা, সম্পাদনা, ডাবিং এবং কালার গ্রেডিংয়ের মতো কাজেও বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে নির্মাণপ্রক্রিয়ার একাধিক ধাপ আগের তুলনায় দ্রুত শেষ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ভারতের বড় চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও এআই নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। ইরোস ইন্টারন্যাশনাল ও জিও স্টুডিওস দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছে। ইরোস ইন্টারন্যাশনাল পুরোপুরি এআই-নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণপ্রক্রিয়ার দিকেও এগোচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রযুক্তিবিদদের মতে, সিনেমায় এআইয়ের ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। হাইপারকগ টেকনোলজিসের প্রতিষ্ঠাতা রঞ্জিত কুমারের মতে, চলচ্চিত্রশিল্পে এআইয়ের সম্ভাব্য সক্ষমতার মাত্র ১০ শতাংশের মতো এখন ব্যবহার করা হচ্ছে। আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে প্রযুক্তির আরও বিকাশ ঘটলে চলচ্চিত্র নির্মাণের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে নতুন কিছু উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিষয় কর্মসংস্থান। ভিএফএক্সশিল্পী, চিত্রসম্পাদক ও সহকারী পরিচালকদের মতো বিভিন্ন পেশার মানুষের কাজের ওপর এআইয়ের প্রভাব পড়ছে বলে চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। প্রযুক্তির কারণে কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় অনেকে পেশা পরিবর্তনের কথাও ভাবছেন।

বিশেষ করে ভিএফএক্সশিল্পীদের কাজের একটি অংশ এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে যে দৃশ্য তৈরি করতে দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পীদের কাজ করতে হতো, এআই টুল ব্যবহার করে তার অনেকটাই দ্রুত করা সম্ভব হচ্ছে। একইভাবে সম্পাদনা ও পোস্ট-প্রোডাকশনের কিছু কাজও স্বয়ংক্রিয় হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির মধ্যেও মানুষের সৃজনশীলতা ও আবেগের বিকল্প হিসেবে এআইকে দেখছেন না অনেক চিত্রনাট্যকার ও নির্মাতা। চিত্রনাট্যকার সুধাকর একলব্যের মতে, এআই দিয়ে একটি সাধারণ কিংবা ভালো চিত্রনাট্য তৈরি করা সম্ভব হলেও মানুষের তৈরি অনবদ্য ও কালজয়ী গল্প সৃষ্টি করা এআইয়ের পক্ষে কঠিন।

প্রযোজকদের একটি অংশের মত, শুধু এআই-নির্ভর চরিত্র ও দৃশ্য দিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রে মানবিক অনুভূতি ও বৈচিত্র্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে শুরুতে প্রযুক্তিগতভাবে আকর্ষণীয় মনে হলেও অতিরিক্ত এআই-নির্ভর সিনেমা সময়ের সঙ্গে দর্শকের কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে।

এ কারণে ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পে এআইকে একদিকে যেমন খরচ ও সময় কমানোর কার্যকর প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে সৃজনশীলতা ও কর্মসংস্থানের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়বে, মানুষের সৃজনশীল ভূমিকা এবং এআইয়ের সক্ষমতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা যায়—সেটিই সামনে চলচ্চিত্রশিল্পের অন্যতম বড় প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: