collected
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবার বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৪ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। একই সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ড. খলিলুর রহমান ২ জুন ২০২৬ সালের নির্বাচনে ৯৯ ভোট পেয়ে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ৮ সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। সফরকালে তাঁর একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও বিভিন্ন সাইড ইভেন্টে অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
প্রথম ভাষণে যেসব বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় তুলে ধরবেন।
অর্থাৎ ভাষণটির সম্ভাব্য আলোচনার পরিধি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জলবায়ু, উন্নয়ন, মানবিক সংকট, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো বৈশ্বিক ইস্যুতেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের জন্য আলাদা গুরুত্ব
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের একটি বিশেষ দিক হলো—দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। ড. খলিলুর রহমান ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের ভোটে ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হলো—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”।
ড. খলিলুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর আস্থা পুনর্গঠন, ঐকমত্য তৈরি এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে ন্যায়সংগত ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালিত হবে, সেটিও তাঁর ঘোষিত অগ্রাধিকারের অংশ।
ফলে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের জাতীয় ও বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকার তুলে ধরার পাশাপাশি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন—এই দুটি বিষয় বাংলাদেশের বহুপক্ষীয় কূটনীতির জন্য উল্লেখযোগ্য সমাপতন।
জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা
জলবায়ু পরিবর্তন এবারের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ২৪ সেপ্টেম্বর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, বৈঠকটি ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়গুলো তুলে ধরার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ২৩ সেপ্টেম্বর ‘Climate Action and the Just Transition’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের আলোচনাতেও প্রধানমন্ত্রীর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি ও অভিযোজনের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরে আসছে। এবারের অধিবেশনেও সেই অবস্থানকে অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও ন্যায়সংগত বৈশ্বিক রূপান্তরের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ থাকছে।
রোহিঙ্গা সংকটও থাকবে আলোচনায়
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ইস্যু। ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন বলে জানানো হয়েছে।
সেখানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরার কথা রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার মানবিক পরিস্থিতি এবং এর সঙ্গে যুক্ত আর্থিক ও সামাজিক চাপের কারণে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনায় ধরে রাখা ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার।
অর্থনৈতিক কূটনীতিতে জোর
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির বাইরে প্রধানমন্ত্রীর সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতিও গুরুত্ব পাচ্ছে। পররাষ্ট্রসচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওয়াল স্ট্রিট, মেটা এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। এসব আলোচনায় বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি ও বাংলাদেশের সম্ভাবনার বিষয়গুলো স্থান পেতে পারে।
একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কর্মসূচিও রয়েছে। কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার সঙ্গেও বৈঠকের সূচি রয়েছে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানবসম্পদ
২৪ সেপ্টেম্বর মাতৃ ও নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং ধাত্রীসেবা নিয়ে আয়োজিত একটি সাইড ইভেন্টেও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। সেখানে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দক্ষ ধাত্রীসেবা নিয়ে বাংলাদেশের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার কথা রয়েছে।
এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-আলোচনার অংশ হিসেবেও তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে ভাষণ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এবারের ভাষণের একটি প্রতীকী দিকও রয়েছে। তিনি তাঁর পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেবেন। এর আগে তাঁর বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে একাধিকবার সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতা আগের সময়ের তুলনায় ভিন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় এখন বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সামনে বাস্তবায়নের প্রশ্ন
জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি দেশের অবস্থান তুলে ধরা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর পরবর্তী বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিউইয়র্কে যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, সেগুলো পরবর্তী সময়ে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, বিনিয়োগ, জলবায়ু অর্থায়ন, রোহিঙ্গা সংকট এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বে কতটা প্রতিফলিত হয়—সেটিই সফরের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল মূল্যায়নের অন্যতম বিষয় হবে।
এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের সামনে একই সঙ্গে দুটি দৃশ্যমান কূটনৈতিক ভূমিকা রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী দেশের সরকারের অবস্থান ও অগ্রাধিকার তুলে ধরবেন, আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্যও আস্থা পুনর্গঠন ও পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার ওপর কেন্দ্রীভূত।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক সফর বাংলাদেশের নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। ২৪ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, উন্নয়ন ভাবনা, জলবায়ু ঝুঁকি, রোহিঙ্গা সংকট, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রত্যাশাগুলো কীভাবে উপস্থাপিত হয়—সেদিকেই থাকবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি।