collected
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সন্তান অপরাধের শিকার হবে কি না, আবার নিজেই অপরাধে জড়িয়ে পড়বে কি না—এমন দুই ধরনের আশঙ্কায় দিন কাটছে অনেক মা-বাবার। বিশেষ করে মোহাম্মদপুর ও উত্তরার মতো এলাকায় সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হচ্ছে অভিভাবকদের।
মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের বাসিন্দা তামান্না ইয়াসমিনের ছেলে মোহাম্মদ ওশান রাজধানীর সেন্ট জোসেফ স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। মাস তিনেক আগে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে এক তরুণ তাকে অনুসরণ করেন এবং বারবার একটি কাগজ দেখার জন্য বলেন। লোকটির আচরণ সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ওশান দৌড়ে একটি দোকানে ঢুকে আশ্রয় নেয়। পরে দোকানে থাকা লোকজন এগিয়ে এলে ওই তরুণ সেখান থেকে চলে যান।
ওশানের মা তামান্না ইয়াসমিন জানান, ছেলের কাছ থেকে ঘটনাটি শুনে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর আগে তাঁর ছেলের দুই বন্ধু পৃথক ঘটনায় ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল। একজনের কাছ থেকে মুঠোফোন এবং আরেকজনের কাছ থেকে সাইকেল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
তামান্নার ভাষায়, সন্তানকে সব সময় চোখে চোখে রাখা সম্ভব নয়। তাই বাইরে নিরাপত্তার পাশাপাশি সন্তানকে বিপদ সম্পর্কে সচেতন করাও জরুরি।
সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর অভিভাবকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তার কাছে থাকা মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন কিশোর অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। তামান্নার পরিবার মনে করে, সন্তানকে নিরাপদ রাখতে অভিভাবকদের বাড়তি নজর দিতে হচ্ছে। তবে শুধু পারিবারিক নজরদারি নয়, বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
তামান্না জানান, ছেলের বিভিন্ন ডিভাইসের পাসওয়ার্ড তাঁর জানা রয়েছে। একই সঙ্গে ছেলেকে ঘরে আটকে না রেখে আইটি ক্লাব ও সায়েন্স ক্লাবের মতো বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করেছেন। এসব কার্যক্রম সন্তানের মানসিক ও সৃজনশীল বিকাশে সহায়ক বলেও মনে করেন তিনি।
ছেলেকে ছোটবেলা থেকেই কোন কোন পরিস্থিতি বিপদ ডেকে আনতে পারে, সে বিষয়ে সচেতন করেছেন তামান্না। পাশাপাশি সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যাতে সে নিজের সমস্যা বা কোনো অস্বস্তিকর ঘটনা সহজে মা-বাবার সঙ্গে শেয়ার করতে পারে।
শিশু অধিকারবিষয়ক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, কিশোর বয়সে অতিরিক্ত নজরদারি অনেক সময় সন্তানদের কাছে খবরদারি মনে হতে পারে। তাই প্রতিটি বিষয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে তাদের পছন্দ ও ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করা এবং এমন সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা নির্ভয়ে মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে পারে।
তামান্না মনে করেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিক চলাফেরা ও স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যাচ্ছে। তাঁর মতে, সন্তানকে পরিবারের পক্ষ থেকে সচেতন ও নিরাপদ রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
অভিভাবকদের মতে, কিশোর গ্যাংয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু সন্তানকে নজরদারিতে রাখাই যথেষ্ট নয়। পরিবারে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি, সন্তানের অনলাইন ও অফলাইন কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সচেতন থাকা, ভালো সামাজিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং বিপদের পরিস্থিতিতে কী করতে হবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত শিক্ষা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।