collected
বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশের বাজারে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছিল। পরের অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে দাঁড়ায়।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমেছে। এর আগে কয়েক বছর ইলিশ উৎপাদনে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও ২০২২-২৩ অর্থবছরের পর থেকে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের মতে, ইলিশ উৎপাদন কমার পেছনে অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত আহরণ, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ এবং নদীতে ডুবোচরের বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। বিশেষ করে অতিসূক্ষ্ম জাল, কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের ব্যবহারে ছোট ও প্রজননক্ষম ইলিশ ধরা পড়ায় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইলিশের বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশও পরিবর্তিত হচ্ছে। নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে গেলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হয়। পাশাপাশি শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের দূষণ এবং নদীতে ডুবোচরের বিস্তার ইলিশের চলাচল ও প্রজননক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে পারে।
খ্যাতিমান ইলিশ গবেষক আনিছুর রহমান বলেন, ইলিশ আহরণ এভাবে কমে যাওয়া উদ্বেগজনক। অতিরিক্ত আহরণ, বেহুন্দি জালের ব্যবহার, ডুবোচরের বিস্তার এবং দূষণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়েও জরুরি গবেষণা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
চাঁদপুরের মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদ বলেন, অতিসূক্ষ্ম জাল ব্যবহার করে অতিরিক্ত আহরণকে ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইলিশের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে গবেষণা ইনস্টিটিউটের একাধিক দল বিভিন্ন বিচরণক্ষেত্রে কাজ করছে। হাতিয়া এলাকায় বেহুন্দি জালের ব্যাপক বিস্তারও গবেষকদের নজরে এসেছে বলে তিনি জানান।
এদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে ইলিশের দামও বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এক কেজি বা তার বেশি ওজনের দেশি ইলিশের দাম বর্তমানে আকার ও মানভেদে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সরবরাহ কম থাকায় সাধারণ ক্রেতাদের জন্য ইলিশ কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাজারে ভারত ও মিয়ানমারের ইলিশ
দেশীয় সরবরাহের ঘাটতি মেটাতে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশ থেকে ইলিশ আমদানিও বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত থেকে গত বছর ইলিশ আমদানি শুরু হওয়ার পর চলতি বছর আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মিয়ানমার থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে ইলিশ আমদানি হয়ে আসছে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্ট—এই দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম জানান, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। আমদানি করা মাছ পরীক্ষা করে কোয়ারেন্টাইন সনদ দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
‘পদ্মার ইলিশ’ নামে বিক্রির অভিযোগ
আমদানি করা ইলিশ দেখতে দেশি ইলিশের মতো হওয়ায় বাজারে পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ রয়েছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, কোনো কোনো ব্যবসায়ী ভারত বা মিয়ানমার থেকে আমদানি করা ইলিশকে দেশি বা ‘পদ্মার ইলিশ’ হিসেবে বিক্রি করছেন।
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত মাছের উৎস ও বিক্রির সময় সঠিক পরিচয় উল্লেখ করা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ বিদেশি ইলিশকে দেশি ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা হলে তা ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণার পর্যায়ে পড়তে পারে।
ক্রেতাদের অভিযোগ, আমদানি করা কিছু ইলিশ দেশি ইলিশের তুলনায় কম দামে বাজারে পাওয়া গেলেও ব্যবসায়ীরা বেশি দামে তা বিক্রি করছেন। ফলে প্রকৃত উৎস না জানলে ক্রেতারা অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে মাছ কিনতে পারেন।
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমদানি করা মাছকে দেশি ইলিশের পরিচয়ে বিক্রি করা হলে তা ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা। এ বিষয়ে বাজার তদারকি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
উৎপাদন বাড়াতে নজরদারি জরুরি
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইলিশ বাংলাদেশের মৎস্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৫ লাখ ২৯ হাজার টন ইলিশ উৎপাদন হয়েছে, যা মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের উৎপাদন ধরে রাখতে প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধ, অতিরিক্ত আহরণ নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং দূষণ কমানোর দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে বাজারে আমদানি করা ইলিশ বিক্রির ক্ষেত্রে মাছের উৎস স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং দেশি ইলিশের নামে বিদেশি মাছ বিক্রি ঠেকাতে বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। ইলিশের উৎপাদন ও বাজার—দুই ক্ষেত্রেই কার্যকর নজরদারি না থাকলে ভবিষ্যতে জাতীয় এই মাছের সংকট আরও প্রকট হতে পারে।