মূল টাকা তুলতে শর্ত, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ক্ষোভ

Pinky Saha Pinky Saha ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:০০ PM BST ৩৩ বার পঠিত
মূল টাকা তুলতে শর্ত, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ক্ষোভ

Photo Collected

নিজেদের জমানো আমানতের মূল টাকা একবারে তুলে নিতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকেরা। টাকা ফেরত পেতে মুনাফা, সুদ ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দাবি পরিত্যাগ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা মামলা না করার লিখিত অঙ্গীকার দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষের এমন শর্তে গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

আর্থিক অনিয়ম ও তারল্য সংকটে থাকা শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এই একীভূতকরণ করা হয়।

চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারের উদ্যোগে ব্যাংকটির আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

টাকা তুলতে ‘অঙ্গীকারনামা’

ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, কোনো গ্রাহক তাঁর মূল টাকা এককালীন তুলতে চাইলে তাঁকে দুই পৃষ্ঠার একটি বিশেষ ‘আবেদনপূর্বক অঙ্গীকারনামা’য় স্বাক্ষর করতে হচ্ছে।

ওই অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে, মূলধন উত্তোলনের পর সংশ্লিষ্ট হিসাবের ‘পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হয়ে যাবে। ফলে আমানতকারী, তাঁর নমিনি, উত্তরাধিকারী কিংবা আইনগত প্রতিনিধি ভবিষ্যতে মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধার দাবি নিয়ে ব্যাংক বা কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ, দাবি, আবেদন কিংবা মামলা করতে পারবেন না।

অঙ্গীকারনামায় আমানতকারীর নিজের স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষরও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

২০ দিনে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা তোলার আবেদন

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, চলতি মাসের ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা আমানত তুলে নেওয়ার আবেদন করেছেন।

এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহককে ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন আমানত এসেছে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাবের বিপরীতে জমা পড়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।

হেয়ারকাট বাতিলের পরও নতুন শর্ত

গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক চিঠিতে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের স্থিতির ওপর দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখার বা ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল।

তীব্র সমালোচনার মুখে পরে গত ২৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, আমানতের ওপর কোনো হেয়ারকাট থাকছে না এবং ১ সেপ্টেম্বর থেকে মূল টাকা তোলা যাবে।

তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই ঘোষণার পরও পুরো মূল টাকা একবারে তুলতে গেলে মুনাফা ও ভবিষ্যতে আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার ত্যাগের অঙ্গীকার দিতে হচ্ছে।

ফলে অনেক গ্রাহক টাকা তোলার জন্য আবেদন করেও শেষ পর্যন্ত টাকা না নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, একীভূত ব্যাংকগুলো যাদের ঋণ দিয়েছিল, তারা মুনাফাসহ আসল অর্থ সময়মতো পরিশোধ না করায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে।

তাঁর ভাষ্য, যারা অতি জরুরি প্রয়োজনে এখনই টাকা তুলে নিচ্ছেন, তাঁদের মুনাফা ছাড়তে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অন্য গ্রাহকেরা মুনাফাসহ তাঁদের আমানত ফেরত পাবেন।

শাখায় শাখায় ভোগান্তির অভিযোগ

এদিকে মাঠপর্যায়ে ব্যাংকের শাখাগুলোর অসহযোগিতা ও দীর্ঘসূত্রতায় গ্রাহকদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জরুরি প্রয়োজনে টাকা উত্তোলনের আবেদন করার পরও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ঘোষিত তিন দিনের মধ্যে টাকা ছাড় করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

তাঁদের অভিযোগ, ২০ থেকে ২৫ দিন ঘুরেও প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন মিলছে না। আবার কোথাও হেয়ারকাট বাতিলের সার্কুলার শাখায় পৌঁছায়নি—এমন কারণ দেখিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক আমানতকারী।

মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ

এরই মধ্যে গত সোমবার সব বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকদের কাছে ব্যক্তিগত মেয়াদি ও স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণের বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

তবে ওই মুনাফার হার এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।

একই চিঠিতে যথাযথ কাগজপত্র যাচাইয়ের পর মৃত গ্রাহকদের বৈধ দাবিদারদের অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্লক করা হিসাবগুলো দ্রুত আনব্লক করে লেনদেনের উপযোগী করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: