collected
বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নীতিগত মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বন্ধ কলকারখানা চালু এবং সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।
সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভায় অংশ নিতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
রাশেদ আল তিতুমীর জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশল রয়েছে। এ কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর আদায় বাড়ানো, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তাঁর মতে, সংস্কার কার্যক্রমের দায়িত্ব ও মালিকানা সরকারের হাতে থাকলে সেগুলো বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার সম্ভাবনা বাড়ে।
ব্যাংক খাতে অনিয়মের প্রভাব কাটিয়ে আস্থা ফিরিয়ে আনাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় পুনঃঅর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনসহ (আইএফসি) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। রাশেদ আল তিতুমীরের মতে, কর অব্যাহতি ও করসংক্রান্ত অনিয়ম রাজস্ব আদায়ে বাধা তৈরি করেছে। এতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
জ্বালানি খাতের ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে সরকারের। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা। এ চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে সরকার জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করেনি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সহায়তায় পরিবার কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানান রাশেদ আল তিতুমীর। তাঁর দাবি, স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পাঁচ বছরে দারিদ্র্যের হার প্রায় পাঁচ শতাংশ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ মূল্যায়নের ভিত্তি এবং পাঁচ শতাংশ বলতে হার, নাকি শতাংশীয় পয়েন্ট বোঝানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। জলবায়ু সহনশীলতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়নেও অর্থায়ন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানান তিনি।
বন্ধ কলকারখানা চালু ও নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বিশেষ অর্থায়নের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন উপদেষ্টা। এ ক্ষেত্রে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের কথা উল্লেখ করলেও এর শর্ত, সুবিধাভোগী ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি। তাঁর মতে, শিক্ষিত ও তরুণ বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং অনেক কলকারখানা বন্ধ থাকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় উৎপাদন বাড়ানো, উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক সম্প্রসারণেও আলোচনা হয়েছে। থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে কৃষিপণ্য, ফল, দুগ্ধজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি। আম, কাঁঠাল ও লিচুর মতো মৌসুমি ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে অপচয় কমিয়ে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন উপদেষ্টা।
চট্টগ্রাম বন্দর ও থাইল্যান্ডের রেনং বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সম্ভাব্য সুবিধা কাজে লাগানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানান তিনি।
চীনের বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের কথাও উল্লেখ করেন রাশেদ আল তিতুমীর। সিলিকন ভ্যালিভিত্তিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান প্লাগ অ্যান্ড প্লের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়ন প্রসঙ্গে উপদেষ্টা জানান, সংস্থাটি ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশে পাঁচ বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। এর মধ্যে সমন্বিত প্রবৃদ্ধি নেটওয়ার্ক উন্নয়ন উদ্যোগের আওতায় সম্ভাব্য অর্থায়ন রয়েছে। এটি এককালীন অনুদান নয়, বরং পরিকল্পিত উন্নয়ন অর্থায়নের অংশ।
সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এসব পরিকল্পনার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সংস্কারের বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কতটা নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।