অভিনেত্রী প্রতিভা রানটা।ছবি: সংগৃহীত
পরিবারের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শিমলা থেকে মুম্বাইয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন প্রতিভা রানটা। অভিনয়ের প্রতি নিজের আগ্রহকে বাস্তবে রূপ দিতে কলেজে পড়ার পাশাপাশি শুরু করেছিলেন অডিশন দেওয়া। টেলিভিশন ও ওটিটিতে কাজ করার পর ‘লাপতা লেডিজ’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পরিসরে পরিচিতি পান এই অভিনেত্রী। সিনেমাটি অস্কারের দৌড়েও ছিল।
এরপর নেটফ্লিক্সের ‘অ্যাকিউজড’ ছবিতে অভিনয় করেও প্রশংসা কুড়িয়েছেন প্রতিভা। এবার নিখিল আদভানি পরিচালিত ওয়েব সিরিজ ‘দ্য রেভোল্যুশনারিজ’-এ অভিনয়ের সুবাদে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে তৈরি এই সিরিজে তরুণ বিপ্লবী প্রতিভা লাহিড়ীর চরিত্রে দেখা গেছে তাঁকে।
সম্প্রতি বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয়জীবন, মুম্বাইয়ে আসার সংগ্রাম, নারী ক্ষমতায়ন এবং নতুন সিরিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন প্রতিভা। মুম্বাইয়ে আসার দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁর কাছে শহরটিতে আসাটাই ছিল সবচেয়ে বড় স্বাধীনতা।
প্রতিভার ভাষ্য, মুম্বাইয়ে আসার জন্য পরিবারকে রাজি করানো ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁদের পরিবার থেকে এর আগে কেউ দিল্লির বাইরেও আসেননি। সেই জায়গা থেকে অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে আসা ছিল বড় সিদ্ধান্ত। পরে সুযোগ পাওয়ার পর প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছেন তিনি।
কলেজে পড়ার সময়ই অডিশন দেওয়া শুরু করেন প্রতিভা। অডিশনের মাধ্যমে ‘কুরবান’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের সুযোগ পান। পরবর্তী সময়ে ‘লাপতা লেডিজ’-এও অডিশন দিয়েই নির্বাচিত হন। তাঁর অভিনীত ‘অ্যাকিউজড’ ছবিটিও দর্শকের প্রশংসা পেয়েছে। ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত যে চরিত্রগুলো করেছেন, সেগুলোর প্রতিটিই তাঁর ব্যক্তিত্বের চেয়ে আলাদা বলে মনে করেন অভিনেত্রী। ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে পারাকেই নিজের বড় অর্জন হিসেবে দেখেন তিনি।
‘দ্য রেভোল্যুশনারিজ’-এ বিপ্লবীর চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে নিজের জীবনের সঙ্গেও একটি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন প্রতিভা। তাঁর মতে, বিপ্লবের শুরু নিজের ভেতর থেকেই করতে হয়। নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত ও অগ্রাধিকারের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার সাহসও এক ধরনের বিপ্লব।
প্রতিভা বলেন, নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই তিনি একসময় পরিবারের প্রচলিত পথের বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁদের পরিবারে আগে কেউ অভিনয় পেশায় ছিলেন না। তবে পরবর্তী সময়ে তাঁর সিদ্ধান্তকে পরিবার সমর্থন করেছে, যা নিয়ে তিনি গর্বিত।
নারী ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন এই অভিনেত্রী। তাঁর মতে, নারীরা কী করতে চান, সেই সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারাটাই সবচেয়ে বড় ক্ষমতায়ন। সমাজে নারীরা অনেক ক্ষেত্রেই এগিয়ে গেলেও বাস্তব পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি বদলায়নি বলেও মনে করেন তিনি। অনেক মেয়ের এগিয়ে যাওয়ার জন্য এখনো পরিবার ও সমাজের সমর্থন প্রয়োজন।
নারী হওয়ার কারণে হীনম্মন্যতায় ভুগেছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিভা জানান, নিজের কথা বলা বা বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া নারীদের অনেক সময় বেশি ভেবেচিন্তে কথা বলতে হয়। কারণ, তাঁদের দ্রুত বিচার করার প্রবণতা সমাজে এখনো রয়েছে। তাঁর মতে, নারী হিসেবে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই নানা ধরনের লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হয়।
ঐতিহাসিক চরিত্রে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেছেন প্রতিভা। তাঁর মতে, ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত কোনো চরিত্রে অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সেই চরিত্রের সংগ্রামকে বোঝা এবং চরিত্রটির প্রতি সৎ থাকা। ‘দ্য রেভোল্যুশনারিজ’-এর জন্য পরিচালক নিখিল আদভানি ও পুরো দল গভীরভাবে গবেষণা করেছে। পাশাপাশি দর্শকের বিনোদনের বিষয়টিও গল্প নির্মাণে গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান তিনি।
সিরিজটির সঙ্গে নিজের শহর শিমলারও একটি বিশেষ যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন প্রতিভা। তাঁর মতে, শিমলার স্থাপত্য ও শহরের গড়নে ব্রিটিশ ও স্কটিশ প্রভাব স্পষ্ট। ব্রিটিশ আমলে ১৮৬৪ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত শিমলা ছিল ভারতের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী। ফলে শহরের বিভিন্ন জায়গার সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলন ও ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসও জড়িয়ে আছে।
‘দ্য রেভোল্যুশনারিজ’-এর চরিত্রগুলো নিয়ে পড়াশোনা করার সময় রাসবিহারী বসু, শচীন্দ্রনাথ সান্যাল, বাঘা যতীন ও তাঁর নিজের চরিত্রের সাহস তাঁকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে বলেও জানান প্রতিভা। শিমলার সঙ্গে এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের মিল খুঁজে পাওয়ায় সিরিজটির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত এক ধরনের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে।