ছবি: সংগৃহীত
মুম্বাইয়ের টিন বাত্তি এলাকার মাত্র ১০ বাই ১০ ফুটের একটি চাওল ঘর থেকে বলিউডের অন্যতম পরিচিত অভিনেতা হয়ে উঠেছেন জ্যাকি শ্রফ। জীবনে খ্যাতি, অর্থ, বড় বাড়ি ও দামি গাড়ি—সবই এসেছিল। কিন্তু একসময় ভয়াবহ আর্থিক সংকটের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাকে।
২০০৩ সালের ছবি ‘বুম’ প্রযোজনার সিদ্ধান্তের পর সেই সংকট আরও গভীর হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়ির আসবাব একে একে বিক্রি করতে হয়েছিল। এমনকি চার শয্যার ফ্ল্যাটও বিক্রি করে স্ত্রী আয়েশা শ্রফ ও দুই সন্তান টাইগার ও কৃষ্ণাকে নিয়ে ছোট বাড়িতে উঠতে হয়েছিল পরিবারকে।
সম্প্রতি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জীবনের সেই কঠিন সময়ের কথা বলেছেন জ্যাকি শ্রফ। তবে এত বছর পরও শৈশবের চাওলের স্মৃতি ভুলতে পারেননি তিনি। জীবনের প্রথম ৩৩ বছর সেখানেই কেটেছে তার। পুরোনো ঘরটি এখন আর তার দখলে নেই। তবু সুযোগ পেলেই সেখানে যান, বারান্দায় দাঁড়িয়ে পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করেন। এমনকি ঘরটি আবার ভাড়া নেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
চাওলের জীবন ছিল খুবই সাধারণ। পরিবারের আর্থিক অবস্থা সচ্ছল ছিল না। সবার জন্য ছিল সাধারণ শৌচাগার, সেখানেও লাইনে দাঁড়াতে হতো। জ্যাকির বাবা ছিলেন জ্যোতিষী। ছোটবেলার সেই অভাবের মধ্যেই গাড়ির প্রতি তার আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল।
অভিনয়ে আসার আগে মডেলিং করতেন জ্যাকি। সেই সময় দেব আনন্দের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। ১৯৮২ সালে দেব আনন্দের ‘স্বামী দাদা’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে অভিষেক। পরের বছর সুভাষ ঘাইয়ের ‘হিরো’ তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে বলিউডে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি।
তবে অর্থ উপার্জন শুরু করার পরও সঞ্চয়ের প্রতি খুব একটা মনোযোগী ছিলেন না জ্যাকি। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, টাকা হাতে এলে পরিবার, বন্ধু ও প্রয়োজনের মানুষের জন্য খরচ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। নিজের বাড়ি কেনার বিষয়েও তার তেমন আগ্রহ ছিল না।
পরে স্ত্রী আয়েশা তাকে বাড়ি কেনার বিষয়ে উৎসাহ দেন। জ্যাকি জানিয়েছেন, তাকে বাড়ি কিনতে সাহায্য করতে আয়েশা নিজের বাড়িও বিক্রি করেছিলেন। জ্যাকির সংগ্রামের সময়ে তিনি চাওলের জীবনযাত্রার সঙ্গেও মানিয়ে নিয়েছিলেন।
এরপর আসে ‘বুম’-এর অধ্যায়। স্ত্রী আয়েশা শ্রফের প্রযোজনায় কাইজাদ গুস্তাদের পরিচালনায় ২০০৩ সালে মুক্তি পায় ছবিটি। এতে অভিনয় করেন অমিতাভ বচ্চন, জ্যাকি শ্রফ, গুলশন গ্রোভার, জিনাত আমান, পদ্মা লক্ষ্মী ও ক্যাটরিনা কাইফ। ছবিটির মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক হয় ক্যাটরিনার।
কিন্তু মুক্তির পর বক্স অফিসে ব্যর্থ হয় ‘বুম’। ছবিটির ব্যর্থতার আর্থিক চাপ সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়ে শ্রফ পরিবার। জ্যাকি পরে জানিয়েছেন, ব্যবসায় টাকা হারানোর বিষয়টি মেনে নিলেও দেনা পরিশোধ করাকে নিজের দায়িত্ব মনে করেছিলেন তিনি। পরিবারের নামের সঙ্গে কোনো ঋণ বা দেনা জড়িয়ে থাকুক, তা চাননি। তাই বেশি কাজ করে সেই অর্থ পরিশোধ করেন।
সেই সময়ের প্রভাব পড়েছিল টাইগার শ্রফের শৈশবেও। এক পুরোনো সাক্ষাৎকারে টাইগার জানিয়েছিলেন, বাড়ির আসবাব একে একে বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। এমনকি তার বিছানাও বিক্রি হয়ে যায়, ফলে একসময় মেঝেতে ঘুমাতে হয়েছিল তাকে। শেষ পর্যন্ত বান্দ্রার চার শয্যার ফ্ল্যাট বিক্রি করে খারে দুই শয্যার একটি বাড়িতে উঠতে হয় পরিবারকে।
তবে ‘বুম’-এর ব্যর্থতায় জ্যাকি শ্রফের ক্যারিয়ার থেমে যায়নি। বরং পরবর্তী সময়ে অভিনয়ে আরও মনোযোগ দেন তিনি। হিন্দি সিনেমার পাশাপাশি আঞ্চলিক ভাষার চলচ্চিত্রেও কাজ করেন এবং ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে নিজের ক্যারিয়ারকে নতুনভাবে এগিয়ে নেন।
১০ বাই ১০ ফুটের চাওল থেকে বলিউডের তারকা—জ্যাকি শ্রফের জীবন তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনৈতিক উত্থান-পতন, ভুল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, কঠিন সময় এবং আবার ঘুরে দাঁড়ানোর অধ্যায়।