কিংবদন্তি অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী।ছবি: সংগৃহীত
চলচ্চিত্রে একজন অভিনেতার ক্যারিয়ারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করে তার সিনেমার বক্স অফিস সাফল্যের ওপর। টানা কয়েকটি ছবি ব্যর্থ হলে অনেক তারকার জনপ্রিয়তা ও কাজের সুযোগ কমে যায়। তবে এই প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রমী উদাহরণ বলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী।
প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জেতার পাশাপাশি ভারতের অন্যতম ব্যবসাসফল সিনেমার নায়ক হয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে তার ঝুলিতে রয়েছে প্রায় ১৮০টি ফ্লপ সিনেমার রেকর্ড। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক ছবির ব্যর্থতার পরও দীর্ঘ সময় ধরে বলিউডে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন এই অভিনেতা।
১৯৭৬ সালে মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় মিঠুনের। প্রথম সিনেমাতেই তার অভিনয় নজর কাড়ে এবং তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার সম্মান অর্জন করেন। অভিষেক ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পাওয়া তার ক্যারিয়ারের শুরুতেই বড় স্বীকৃতি এনে দেয়।
এরপর আশির দশকের শুরুতে ‘শৌকিন’ ও ‘অশান্তি’র মতো সিনেমার মাধ্যমে বাণিজ্যিক সাফল্যের দেখা পান তিনি। তবে তার ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৮২ সালে ‘ডিস্কো ড্যান্সার’ মুক্তির পর। সিনেমাটির মাধ্যমে মিঠুন রাতারাতি ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় তারকায় পরিণত হন। সিনেমাটির গান, নাচ এবং মিঠুনের পর্দার উপস্থিতি তাকে সাধারণ দর্শকের কাছে ব্যাপক পরিচিত করে তোলে।
‘ডিস্কো ড্যান্সার’-এর সাফল্যের পর মিঠুনের ক্যারিয়ারে আসে স্বর্ণযুগ। ১৯৮৫ সালে সিনেমাটি রাশিয়ায় মুক্তি পাওয়ার পরও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সিনেমাটি বিশ্বব্যাপী প্রায় ১০০ কোটি রুপি আয় করে। এটি সেই সময়ের জন্য বিরাট সাফল্য ছিল এবং ‘শোলে’-কে পেছনে ফেলে ভারতের সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমার রেকর্ডও অর্জন করেছিল। ১৯৯৪ সালে ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’ মুক্তির আগ পর্যন্ত রেকর্ডটি বহাল ছিল।
তবে ক্যারিয়ারের এই সাফল্যের সময়েই মিঠুন একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করতে শুরু করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে বছরে কখনো আট থেকে ১২টি সিনেমায় কাজ করেছেন তিনি। ফলে তার অভিনীত সিনেমার সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে সব সিনেমা দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
নব্বইয়ের দশকে বলিউডে নতুন প্রজন্মের তারকারা জনপ্রিয় হয়ে উঠলে মিঠুন তুলনামূলক কম বাজেটের অ্যাকশনধর্মী সিনেমায় বেশি অভিনয় করতে থাকেন। এসব সিনেমার অনেকগুলো অল্প সময়ের মধ্যে নির্মাণ ও মুক্তি দেওয়া হতো। এক দশকেই তিনি প্রায় একশ সিনেমায় অভিনয় করেন বলে বিভিন্ন চলচ্চিত্রভিত্তিক পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়। এর বড় একটি অংশ বক্স অফিসে ব্যর্থ হয়।
নায়ক হিসেবে মিঠুনের সর্বশেষ একক বড় হিট হিসেবে ১৯৯৫ সালের ‘রাবণ রাজ’-এর নাম উল্লেখ করা হয়। এরপরও অবশ্য অভিনয় থেকে দূরে সরে যাননি তিনি। বরং সময়ের সঙ্গে নিজের অভিনয়ের ধরন ও চরিত্রের পরিধি বদলেছেন।
পাঁচ দশকের ক্যারিয়ারে মিঠুন চক্রবর্তী আড়াইশোর বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৮০টি সিনেমাকে বক্স অফিসে ফ্লপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে অন্তত ৪৫টি সিনেমাকে চরম ব্যর্থতা বা ‘ডিজাস্টার’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এই সংখ্যাই মিঠুনের ক্যারিয়ারের একটি অস্বাভাবিক দিক তুলে ধরে—এত বিপুলসংখ্যক সিনেমা ব্যর্থ হওয়ার পরও তিনি দীর্ঘদিন ধরে বলিউডের পরিচিত মুখ হিসেবে টিকে আছেন।
২০০০-এর দশকে এসে মিঠুনের ক্যারিয়ারে আরও একটি পরিবর্তন দেখা যায়। শুধু প্রধান চরিত্র নয়, পার্শ্ব চরিত্রেও নিয়মিত অভিনয় শুরু করেন তিনি। বড় বাজেটের সিনেমাতেও দেখা যায় তাকে। বয়স ও সময়ের সঙ্গে চরিত্র বাছাইয়ে পরিবর্তন আনলেও পর্দায় তার উপস্থিতি দর্শকের কাছে গুরুত্ব ধরে রাখে।
এরপর ২০২২ সালে ৭২ বছর বয়সে ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য পান মিঠুন। বিবেক অগ্নিহোত্রীর ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ সিনেমায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। সিনেমাটি বক্স অফিসে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩৫০ কোটি রুপি আয় করে বলে বিভিন্ন বক্স অফিস পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়। এটি মিঠুনের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
মিঠুন চক্রবর্তীর ক্যারিয়ার তাই বলিউডের প্রচলিত বক্স অফিস হিসাবের একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়। একদিকে জাতীয় পুরস্কারজয়ী অভিনেতা, অন্যদিকে বিপুলসংখ্যক ফ্লপ সিনেমার রেকর্ড—দুই বিপরীত বাস্তবতাই একই ক্যারিয়ারে ধারণ করেছেন তিনি। ‘ডিস্কো ড্যান্সার’-এর তুমুল জনপ্রিয়তা থেকে ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’-এর সাফল্য—দীর্ঘ পাঁচ দশকের পথচলায় বারবার নতুনভাবে নিজেকে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছেন এই অভিনেতা।