ছবি: সংগৃহীত
‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর ২’ মুক্তির পর রাতারাতি বদলে গিয়েছিল নওয়াজুদ্দিন সিদ্দিকীর জীবন। বছরের পর বছর ছোট চরিত্রে অভিনয়, কাজের অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার পর হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন তিনি। অনুরাগ কশ্যপ পরিচালিত সিনেমাটিতে ফয়জল খানের চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়ে। এরপরই বলিউডে তাঁর সামনে খুলে যায় বড় সুযোগের দরজা।
অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, একসময় নওয়াজুদ্দিনের টেবিলে জমা হয়েছিল প্রায় ২০০টি চিত্রনাট্য। শুধু তাই নয়, সঙ্গে থাকত ‘ব্ল্যাংক চেক’—অর্থাৎ নিজের ইচ্ছামতো পারিশ্রমিকের অঙ্ক লেখার সুযোগ। কিন্তু এত বড় প্রস্তাবও তাঁকে টলাতে পারেনি।
সম্প্রতি এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই সময়ের স্মৃতি তুলে ধরেছেন নওয়াজুদ্দিন। অভিনেতা জানান, ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর ২’ মুক্তির পরই প্রথমবারের মতো নিজেকে তারকা বলে মনে হয়েছিল তাঁর।
সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, ছবিটি মুক্তির পর অন্তত ২০০টি চিত্রনাট্য তাঁর হাতে এসেছিল। টেবিলে পড়ে থাকত ব্ল্যাংক চেকও। নির্মাতারা তাঁকে বলতেন, চিত্রনাট্যটি নিতে এবং নিজের পছন্দমতো পারিশ্রমিক লিখতে।
বলিউডের মতো প্রতিযোগিতাপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিতে এমন প্রস্তাব যে কোনো অভিনেতার জন্যই লোভনীয়। বিশেষ করে এমন একজন শিল্পীর কাছে, যিনি বছরের পর বছর কাজের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু নওয়াজুদ্দিন তখনও নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
তিনি জানান, ওই সময় পাওয়া কোনো চিত্রনাট্যই তাঁর পছন্দ হয়নি। তাই জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে ভেসে একের পর এক সিনেমায় চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে অপেক্ষা করার পথ বেছে নেন। তাঁর যুক্তি ছিল, বছরের পর বছর যখন অপেক্ষা করেই কাটিয়েছেন, তখন আরও দু-তিন বছর অপেক্ষা করতেও আপত্তি নেই।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল নওয়াজুদ্দিনের দীর্ঘ সংগ্রামের অভিজ্ঞতা। মুম্বাইয়ে অভিনয়ের সুযোগ পেতে তাঁকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন তিনি।
‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’, ‘পিপলি লাইভ’, ‘কাহানি’সহ একাধিক সিনেমায় অভিনয় করে আলাদা পরিচিতি পেলেও ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর’ সিরিজের ফয়জল খান চরিত্র তাঁকে ব্যাপক দর্শকপরিচিতি এনে দেয়।
২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘গ্যাংস অব ওয়াসিপুর ২’ ছিল অনুরাগ কশ্যপের দুই পর্বের গ্যাংস্টার সিনেমার দ্বিতীয় অধ্যায়। ধানবাদের অপরাধজগতের পটভূমিতে খান ও কুরেশি পরিবারের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব, প্রতিশোধ ও ক্ষমতার লড়াই উঠে এসেছে সিনেমাটিতে।
ছবির শুরুতে ফয়জল খান ছিলেন অনেকটাই নির্বিকার ও লক্ষ্যহীন এক তরুণ। কিন্তু পারিবারিক সংঘাত, ব্যক্তিগত ক্ষতি ও বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বদলে যায় তাঁর চরিত্র। একসময় সেই শান্ত স্বভাবের মানুষটিই হয়ে ওঠেন নির্মম গ্যাংস্টার।
ফয়জালের এই পরিবর্তন নওয়াজুদ্দিন পর্দায় তুলে ধরেছিলেন তীব্রতা ও সংযমের মিশেলে। ফলে চরিত্রটি সিনেমাটির অন্যতম স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত হয়। একই সঙ্গে নওয়াজুদ্দিনও প্রতিষ্ঠা পান মূলধারার দর্শকের কাছে।
স্বাধীনধারার সিনেমা থেকে মূলধারার বাণিজ্যিক ছবি—দুই জায়গাতেই নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন এই অভিনেতা। চরিত্র বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও তাঁর এই সতর্কতা বরাবরই লক্ষণীয়। জনপ্রিয়তা কিংবা পারিশ্রমিকের চেয়ে ভালো চরিত্র তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণেই হয়তো বলিউডের প্রচলিত নায়ক-নির্ভর ধারার বাইরে থেকেও নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করতে পেরেছেন নওয়াজুদ্দিন। তাঁর অভিনয়জীবনে ‘তারকা’ হওয়ার চেয়ে শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করাটাই বরাবর অগ্রাধিকার পেয়েছে।
এখনো সেই পথেই হাঁটছেন তিনি। গত ৮ মে মুক্তি পেয়েছে নওয়াজুদ্দিন অভিনীত ‘ম্যায় অ্যাক্টর নেহি হুঁ’। সিনেমাটিতে তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হলেও সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র থেকে নেতিবাচক।
তবে সামনে আরও বড় পরিসরের কাজ নিয়ে হাজির হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অভিনেতা। ‘তুম্বাড় ২’-এ আলিয়া ভাটের সঙ্গে দেখা যাবে তাঁকে। ২০১৮ সালের আলোচিত হরর সিনেমা ‘তুম্বাড়’-এর এই সিক্যুয়েল আগের ছবির তুলনায় আরও বড় পরিসরে নির্মিত হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুম্বাইয়ে ৭ থেকে ৮ একর জায়গাজুড়ে সিনেমাটির বিশাল সেট নির্মাণ করা হচ্ছে। সেখানে একটি পুরো শহরের আদল তৈরি করা হবে। ছবিটির বাজেট প্রায় ১০০ কোটি রুপি। পরিচালনা করছেন আদেশ প্রসাদ। ২০২৭ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির কথা রয়েছে ‘তুম্বাড় ২’-এর।
২০০টি চিত্রনাট্য আর ব্ল্যাংক চেকের হাতছানি উপেক্ষা করে যে অভিনেতা অপেক্ষা করতে পেরেছিলেন, তাঁর ক্যারিয়ারের গল্প যেন আরও একবার মনে করিয়ে দেয়—সুযোগ যত বড়ই হোক, নিজের পছন্দের চরিত্রের জন্য অপেক্ষা করাও কখনো কখনো সাফল্যের অংশ হয়ে ওঠে।