৬৩০ বছরের সাক্ষী তিন তেঁতুলগাছ, আজও জগদীশপুরের মিলনস্থল

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ AM BST খুলনা ২৫ বার পঠিত
৬৩০ বছরের সাক্ষী তিন তেঁতুলগাছ, আজও জগদীশপুরের মিলনস্থল

collected

সময় বদলেছে, হারিয়ে গেছে জমিদারি প্রথা, বদলে গেছে বুড়ি ভৈরব নদের প্রবাহ। কিন্তু শত শত বছরের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর গ্রামের বিশাল তিনটি তেঁতুলগাছ।

যশোর শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত জগদীশপুর গ্রাম। গ্রামটিতে যাওয়ার পথে মুক্তাদাহ থেকে জগদীশপুর মিয়াবাড়ি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে রয়েছে আম, কাঁঠাল ও লিচুর বাগান। ছায়াঘেরা ও নিরিবিলি পরিবেশ পেরিয়ে মিয়াবাড়ির সামনে পৌঁছালে চোখে পড়ে প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছ।

ভরদুপুরের তীব্র গরমেও গাছগুলোর নিচে দাঁড়ালে পাওয়া যায় স্বস্তির ছায়া ও শীতল বাতাস। গাছের গোড়া বাঁধাই করে তৈরি করা হয়েছে বসার জায়গা। সেখানে প্রতিদিন স্থানীয় মানুষ ও পথচারীদের বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। গাছের ডালে শালিক, চড়ুই ও ঘুঘুসহ নানা পাখির আনাগোনাও রয়েছে।

গাছের নিচে বিশ্রাম নেওয়া মানুষের শরীরে পাখির বিষ্ঠা না পড়ার জন্য কোনো কোনো জায়গায় টিনের ছাউনিও দেওয়া হয়েছে।

প্রজন্মের স্মৃতিতে তেঁতুলগাছ

জগদীশপুর গ্রামের ৯২ বছর বয়সী সরোয়ার হাওলাদারের শৈশবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে এই তেঁতুলগাছগুলো। তাঁর ভাষ্য, জন্মের পর থেকেই তিনি গাছগুলোকে একই অবস্থায় দেখে আসছেন। তাঁর বাবা-দাদারাও এসব গাছ দেখেছেন বলে জানান তিনি।

শৈশবের স্মৃতি বলতে গিয়ে সরোয়ার হাওলাদার জানান, বন্ধু বরকত ও সাখাওয়াতকে সঙ্গে নিয়ে ছোটবেলায় প্রায়ই তেঁতুল পাড়তেন। সেই তেঁতুল খেজুরের গুড়ে ভিজিয়ে রেখে পরে হাতে নিয়ে গ্রাম ঘুরে খেতেন। এখন বয়সের ভারে আগের মতো ঘোরাফেরা না করলেও দুপুরের তীব্র রোদের সময় গাছের নিচে বসে স্থানীয়দের সঙ্গে গল্প করেন তিনি।

নামাজের পর আড্ডা, পথচারীর বিশ্রাম

তেঁতুলগাছগুলোর পাশেই রয়েছে একটি মসজিদ। নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের অনেকেই গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে গল্প ও আড্ডায় মিলিত হন। পথচারীরাও এখানে কিছু সময় বিশ্রাম নেন।

কাছেই রয়েছে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশেও রয়েছে আরেকটি প্রাচীন তেঁতুলগাছ। সেই গাছের নিচে বসার ব্যবস্থা রয়েছে এবং পাশে রয়েছে চায়ের দোকান। স্থানীয়রা চা পান করতে করতে সেখানে গল্প-আড্ডায় মেতে ওঠেন।

প্রথম দুটি গাছ থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে রয়েছে আরও একটি বড় তেঁতুলগাছ। গ্রামের মানুষ নিয়মিত এর নিচে বসে সময় কাটালেও গাছগুলোর উচ্চতা বা বেড় কত, তা আগে মাপা হয়নি। গাছের মাপ জানতে চাইলে স্থানীয়রা রশি এনে তা মাপার চেষ্টা করেন।

৬৩০ বছরের পুরোনো বলে দাবি

তেঁতুলগাছগুলোর বয়স সম্পর্কে মিয়াবাড়ির সদস্য আ ন ম মোস্তাদুদ দস্তগীরের ভাষ্য, অতীতে একজন ইতালীয় উদ্ভিদবিশেষজ্ঞ এই এলাকায় এসে গাছগুলোর বয়স নির্ধারণে কার্বন পরীক্ষার সহায়তা নিয়েছিলেন। ওই পরীক্ষায় তখন গাছগুলোর বয়স ৬৩০ বছর পাওয়া যায় বলে তিনি জানান।

কালের বিবর্তনে গাছগুলোর ডালপালায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও এখনো সেগুলো সবুজ-শ্যামল ও জীবন্ত রয়েছে।

জগদীশপুর নামের পেছনের গল্প

গ্রামের নামকরণ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে একটি প্রচলিত ইতিহাস রয়েছে। ৮০ বছর বয়সী শের আলী জানান, মুরব্বিদের কাছ থেকে তাঁরা শুনেছেন, প্রায় সাড়ে ছয় শ বছর আগে বুড়ি ভৈরব নদের বুক চিরে জেগে ওঠা চরে জগদীশ ঘোষ নামের এক ব্যক্তি প্রথম বসতি গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে সেই জনপদের নাম হয় জগদীশপুর।

গ্রামের অতীতের সঙ্গে জমিদারি ব্যবস্থার স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। মিয়াবাড়ির সামনে এখনো জমিদার ভবনের একটি ফটক রয়েছে। সেখানে লেখা আছে—‘জমিদার ভবন, মিয়াবাড়ি-জগদীশপুর এস্টেট’। ভবনটি বাংলা ১৩১৪ সন, অর্থাৎ ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বলে উল্লেখ রয়েছে। চুন-সুরকি দিয়ে নির্মিত সেই ভবনের একটি অংশ এখনো টিকে আছে।

আজ তিন তেঁতুলগাছ শুধু প্রাচীন বৃক্ষ হিসেবেই নয়, জগদীশপুর গ্রামের সামাজিক জীবনেরও অংশ। বিকেলে বয়োজ্যেষ্ঠদের গল্পের আসর থেকে শুরু করে তরুণদের আড্ডা—সবকিছুরই এক পরিচিত ঠিকানা গাছগুলোর ছায়া। শত শত বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এসব গাছ যেন নীরবে ধারণ করে আছে একটি জনপদের ইতিহাস, স্মৃতি ও মানুষের ভালোবাসা।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: