ছবি: সংগৃহীত
রহস্য, রটনা, সৌন্দর্য আর অমিতাভ বচ্চন—বলিউড অভিনেত্রী রেখার নামের সঙ্গে যেন বহু বছর ধরেই জড়িয়ে আছে এই শব্দগুলো। তাঁকে নিয়ে আলোচনা থামেনি কয়েক দশকেও। প্রজন্ম বদলেছে, বলিউডে এসেছে নতুন তারকা; কিন্তু রেখাকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ আজও অটুট। বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি এখনো পরিচিত ‘চিরসবুজ’ অভিনেত্রী হিসেবে।
১০ অক্টোবর ৭২ বছর পূর্ণ করেছেন রেখা। তাঁর প্রকৃত নাম ভানুরেখা গণেশন। জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের শুভেচ্ছা, পুরোনো ছবি ও সিনেমার দৃশ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন তিনি। তবে রেখাকে নিয়ে আগ্রহ কেবল জন্মদিনেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর অভিনয়, সৌন্দর্য, ব্যক্তিজীবন এবং নানা সময়ের বিতর্ক তাঁকে দীর্ঘদিন ধরেই বলিউডের আলোচিত ব্যক্তিত্ব করে রেখেছে।
অমিতাভ-রেখা: পর্দার রসায়ন থেকে গুঞ্জন
রেখার নাম উচ্চারিত হলেই অনেকের মনে পড়ে অমিতাভ বচ্চনের কথা। বছরের পর বছর ধরে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে বলিউডে নানা গুঞ্জন প্রচলিত। বিশেষ করে ‘সিলসিলা’ ছবিতে তাঁদের উপস্থিতি এবং ‘দেখা এক খোয়াব তো ইয়ে সিলসিলে হুয়ে’ গানের দৃশ্য দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
দিগন্তজোড়া টিউলিপ ফুলের মধ্যে অমিতাভ ও রেখার উপস্থিতি, গানের সঙ্গে রেখার আবেগঘন অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি আজও আলোচনায় আসে। অনেক দর্শক পর্দার সেই রসায়নের সঙ্গে বাস্তব জীবনের প্রেমের গল্প মিলিয়ে দেখেন। তবে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রচলিত সব গল্পের সত্যতা নিশ্চিত নয়।
সংগ্রাম দিয়ে শুরু হয়েছিল পথচলা
রেখার জীবন শুধু সৌন্দর্য কিংবা প্রেমের গুঞ্জনের গল্প নয়। এর পেছনে রয়েছে শৈশবের সংকট, পারিবারিক দায়িত্ব এবং চলচ্চিত্রজগতে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কঠিন লড়াই। ১৯৫৪ সালে তামিল অভিনেতা জেমিনি গণেশন ও তেলেগু অভিনেত্রী পুষ্পাভ্যালির ঘরে জন্ম তাঁর। শৈশব থেকেই বাবার স্বীকৃতি নিয়ে সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাঁকে।
পরিবারে আর্থিক সংকট দেখা দিলে অল্প বয়সেই দায়িত্ব নিতে হয় রেখাকে। নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি মা ও ভাইবোনদের দেখাশোনার ভারও এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একসময় তিনি বলেছিলেন, বেশির ভাগ সময় ভাইবোনদের মা, এমনকি নিজের মায়েরও মা হয়ে থাকতে হয়েছিল তাঁকে।
শুরুতে বিমানবালা হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও পরিস্থিতি তাঁকে চলচ্চিত্রের দিকে নিয়ে যায়। পরিবারের অভাব দূর করতে কিশোরী বয়সেই অভিনয়কে জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেন তিনি। কিন্তু বলিউডে জায়গা করে নেওয়া সহজ ছিল না। গায়ের রং ও হিন্দি ভাষায় দুর্বলতার কারণে শুরুতে প্রত্যাখ্যানের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে।
প্রথম সিনেমা ও শুরুর কঠিন অভিজ্ঞতা
১৯৬৬ সালে তেলেগু ছবি ‘রাঙ্গুলা রত্নম’-এ শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন রেখা। পরে ১৯৬৯ সালে ‘গোয়াদাল্লি সিআইডি ৯৯৯’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের পথ এগিয়ে যায়। ১৯৭০ সালে ‘শাওন ভাদো’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ছবিটি মুক্তির পর সাফল্য পেলে বলিউডে তাঁর অবস্থান শক্ত হতে শুরু করে।
তবে শুরুর দিনগুলো ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। ‘আনজানা সফর’ ছবির শুটিংয়ে সহশিল্পী বিশ্বজিতের সঙ্গে একটি দীর্ঘ চুম্বনের দৃশ্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। রেখার জীবনীকার ইয়াসির ওসমানের বইয়ে ওই শুটিংয়ের অভিজ্ঞতা এবং দৃশ্যটি ঘিরে রেখার অস্বস্তির কথা উঠে এসেছে।
পরবর্তী সময়ে একের পর এক ছবিতে অভিনয় করে নিজের অবস্থান তৈরি করেন রেখা। ‘মুকাদ্দর কা সিকান্দর’, ‘মিস্টার নটবরলাল’, ‘খুন-পাসিনা’, ‘উৎসব’, ‘সিলসিলা’ এবং ‘উমরাও জান’-এর মতো ছবিতে তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে ‘উমরাও জান’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।
ব্যক্তিজীবন নিয়ে নানা আলোচনা
রেখার ব্যক্তিজীবনও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার কেন্দ্রে। ১৯৮০ সালের ২২ জানুয়ারি ঋষি কাপুর ও নিতু কাপুরের বিয়ের অনুষ্ঠানে সিঁথিতে সিঁদুর ও গলায় মঙ্গলসূত্র পরে তাঁর উপস্থিতি বলিউডে কৌতূহল তৈরি করেছিল। সে সময় অমিতাভের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছিল।
পরে রেখা জানিয়েছিলেন, একটি ছবির শুটিং থেকে সরাসরি বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন তিনি। মেকআপ তোলার কথা তাঁর মনে ছিল না। ঘটনাটি নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা চলেছিল বলিউডে।
এরপর শিল্পপতি মুকেশ আগরওয়ালের সঙ্গে বিয়ে হয় রেখার। কিন্তু বিয়ের প্রায় এক বছর পর মুকেশের আত্মহত্যার ঘটনায় তাঁর ব্যক্তিজীবনে নেমে আসে আরেকটি কঠিন অধ্যায়। মুকেশ কেন আত্মহত্যা করেছিলেন, তা নিয়ে নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিনেতা বিনোদ মেহরার সঙ্গেও রেখার সম্পর্ক নিয়ে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। তাঁদের বিয়ে এবং বিনোদের পরিবারের আপত্তি নিয়ে বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে বর্ণনা পাওয়া যায়। তবে এসব ঘটনার সব বিবরণ রেখা নিজে প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি।
পুরস্কার ও চিরসবুজ উপস্থিতি
ব্যক্তিজীবন নিয়ে এত আলোচনা থাকলেও রেখার পরিচয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে তাঁর অভিনয় ও অর্জন। তিনি পেয়েছেন পদ্মশ্রী, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং একাধিক ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নিজের দক্ষতা ও পর্দার উপস্থিতি দিয়ে তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র অবস্থান।
বর্তমানে বড় পর্দায় তাঁকে নিয়মিত দেখা যায় না। তবে মুম্বাইয়ের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও তারকাদের বিভিন্ন আয়োজনে তাঁর উপস্থিতি এখনো নজর কাড়ে।
রেখাকে ঘিরে রহস্য, গুঞ্জন ও গল্পের শেষ নেই। কিন্তু এসবের বাইরেও রয়েছে একজন নারীর সংগ্রাম, পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেওয়ার ইতিহাস এবং বলিউডে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ পথচলা। ৭২ বছর পূর্ণ করেও রেখা তাই ভারতীয় চলচ্চিত্রের আলোচিত ও স্মরণীয় এক নাম।