collected
পরপর দুই মৌসুমে আলুর বাজারে ধস ও কৃষকের লোকসানের প্রভাব পড়েছে চলতি মৌসুমের বীজ আলু বেচাকেনায়। রংপুর অঞ্চলে আলুর দাম কমে যাওয়ায় বীজ রোপণের ভরা মৌসুমেও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ আলু সংগ্রহে আগ্রহ হারাচ্ছেন ডিলাররা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিলারদের বীজ আলু সংগ্রহে ইনসেনটিভ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএডিসি।
রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় বিএডিসির অনুমোদিত ডিলার রয়েছেন ৮১৩ জন। চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে বীজ আলু বিক্রি শুরু হয়েছে। কিন্তু গত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৭৪ জন ডিলার মাত্র ৩৬৬ মেট্রিক টন বীজ আলু সংগ্রহ করেছেন।
চলতি মৌসুমে পাঁচ জেলায় ৪ হাজার ৪৭৪ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৮ শতাংশের কিছু বেশি। জেলা অনুযায়ী রংপুরে ২২৬ মেট্রিক টন, কুড়িগ্রামে ২০, নীলফামারীতে ৩৮, লালমনিরহাটে ৪৫ এবং গাইবান্ধায় ৪০ মেট্রিক টন বীজ আলু বিক্রি হয়েছে। সবচেয়ে কম বিক্রি হয়েছে কুড়িগ্রামে।
বিএডিসি ও সংশ্লিষ্টদের মতে, হিমাগারে পর্যাপ্ত খাবার আলু থাকা, পরপর দুই বছর কৃষকের লোকসান এবং বাজারে আলুর দাম কমে যাওয়ায় নতুন মৌসুমে বীজ আলুর চাহিদা কমেছে। বর্তমানে হিমাগারে থাকা খাবার আলুর দাম কেজিপ্রতি প্রায় ১২ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে নতুন মৌসুমে আলু চাষ করে লাভ হবে কি না, তা নিয়ে কৃষকদের মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
রংপুর অঞ্চলের ১২টি হিমাগার থেকে ডিলারদের কাছে বিএডিসির বীজ আলু সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত গ্রেড-১ বীজ আলুর দাম কেজিপ্রতি ২৭ টাকা। অথচ বাজারে খাবার আলুর দাম এর প্রায় অর্ধেক। ফলে ২৭ টাকা কেজি দরে বীজ সংগ্রহ করে বাজারজাত করে লাভের সম্ভাবনা দেখছেন না অনেক ডিলার।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের কাকিনা বাজার এলাকার ডিলার মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, গত বছর তিনি পাঁচ টন বীজ আলু তুলেছিলেন এবং এবারও একই পরিমাণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে গত বছরের মতো এবারও লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি। তার ভাষ্য, লাইসেন্স ঠিক রাখার জন্যই লোকসান মেনে বীজ আলু তুলতে হচ্ছে।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের ডিলার সিরাজুল ইসলাম বলেন, দেশে উৎপাদিত আলুর চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মানসম্মত আলু বিদেশে রপ্তানি করা গেলে কৃষক, ডিলার ও কৃষি খাত সবাই উপকৃত হতো। কিন্তু আলু উৎপাদন ও বিপণন নিয়ে কার্যকর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ২০২৪-২৫ মৌসুমে ১ লাখ ১৯ হাজার ৭৩৯ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা কমে ১ লাখ ৫ হাজার ৮৮৫ হেক্টরে দাঁড়ায়। চলতি অর্থবছরের খসড়া হিসাবে আবাদ হয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে। অন্যদিকে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রায় ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন আলু উৎপাদিত হয়েছে।
রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, চাহিদার তুলনায় আলুর উৎপাদন বেশি হওয়ায় উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে এবং দাম কমেছে। এ কারণে কৃষক লোকসানে পড়েছেন। কৃষকদের আলুর পাশাপাশি ভুট্টাসহ অন্যান্য লাভজনক ফসল চাষে আগ্রহী করার চেষ্টা চলছে।
বিএডিসি রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বলেন, ডিলাররা সাধারণত কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী বীজ সংগ্রহ করেন। কিন্তু টানা দুই বছর লোকসানের কারণে এবার কৃষকের আগ্রহ কম। হিমাগারে এখনও প্রচুর আলু রয়েছে এবং দামও কমছে। ডিলারদের জন্য ইনসেনটিভ ঘোষণা ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় থাকায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আশা করছে বিএডিসি।
কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, খাবার আলুর দাম যেখানে প্রায় ১২ টাকা, সেখানে সরকারি বীজ আলুর দাম ২৭ টাকা হওয়ায় কৃষক ও ডিলারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তার মতে, উৎপাদন পরিকল্পনা, সংরক্ষণ সক্ষমতা, রপ্তানি বাজার এবং কার্যকর বিপণন ব্যবস্থা গড়ে না তুললে কৃষকের লোকসানের চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।