বাংলা-উর্দু সিনেমার অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই

Pinky Saha Pinky Saha ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১:১৪ PM BST ৩৩০ বার পঠিত
বাংলা-উর্দু সিনেমার অভিনেত্রী নাসিমা খান আর নেই

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান মারা গেছেন। রোববার (১১ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। অভিনেত্রীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তাঁর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নুরজাহান বেগম এবং চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক ও অভিনেতা সনি রহমান।

ষাটের দশকে ঢাকার চলচ্চিত্রে পরিচিতি পাওয়া অভিনেত্রীদের মধ্যে নাসিমা খান ছিলেন অন্যতম। বাংলা ও উর্দু—দুই ভাষার সিনেমায় অভিনয় করে তিনি নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন। ১৯৫৯ সালে এ জে কারদার পরিচালিত উর্দু চলচ্চিত্র ‘জাগো হুয়া সাভেরা’র মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ‘তানহা’য় অভিনয় করেন তিনি। ১৯৬১ সালে সালাহউদ্দিন পরিচালিত ‘যে নদী মরু পথে’ ছবিতে অভিনয়ের পর তাঁর পরিচিতি বাড়ে। ‘সূর্যস্নান’ তাঁকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতেও সাহায্য করে।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’, ‘আপন দুলাল’, ‘উলঝন’, ‘দুই ভাই’, ‘গৌরী’, ‘আমার বৌ’ ও ‘ঢেউয়ের পরে ঢেউ’সহ বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন নাসিমা খান। ঢাকার পাশাপাশি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে নির্মিত সিনেমাতেও কাজ করেছেন তিনি। তাঁর অভিনীত লাহোরের চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নয়ি লায়লা নয়া মজনু’, ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’, ‘আঁসু বন গয়ে মোতি’ ও ‘রোড টু সোয়াত’। ‘গীত কাহিঁ সংগীত কাহিঁ’ ছবির প্রযোজনার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।

স্বাধীনতার পর একসময় চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে গেলেও পরে টেলিভিশনে উপস্থাপনার মাধ্যমে পর্দায় ফেরেন নাসিমা খান। পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেন। তাঁর পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘মাতৃত্ব’, ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ ও ‘মাটির পিঞ্জিরা’। জীবনের শেষদিকে অভিনয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়লেও বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে চলচ্চিত্রাঙ্গনের স্মরণীয় মুখগুলোর একজন করে রেখেছে।

১৯৪৪ সালের ৬ আগস্ট পুরান ঢাকার লালবাগে জন্মগ্রহণ করেন নাসিমা খান। তাঁর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার রাঢ়িখাল গ্রামে। বাবা মোহাম্মদ মাসুদ খান ছিলেন ব্যবসায়ী। ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। কামরুন্নেসা স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি নাচও শিখেছিলেন। অভিনেতা ও চলচ্চিত্র নির্মাতা খান আতাউর রহমানের সঙ্গে তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠতা ছিল। পরিবারের প্রাথমিক দ্বিধা কাটিয়ে অভিনয়ের অনুমতি পেলেও শর্ত ছিল, পড়াশোনায় অবহেলা করা যাবে না।

জীবনের শেষ কয়েক মাসে ব্যক্তিগত এক শোকের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে এই অভিনেত্রীকে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন তিনি। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় বিভিন্ন সময় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছিলেন নাসিমা খান। তাঁর বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।

১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত আত্মকথনে অভিনয়জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলেন নাসিমা খান। সেখানে ‘সূর্যস্নান’-এর শুটিংয়ে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে কাজ, ‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে আহত হওয়া এবং জহির রায়হানের ‘দুই ভাই’ চলচ্চিত্রে কাজের স্মৃতির কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনি। তাঁর স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে ষাটের দশকের চলচ্চিত্রাঙ্গনের পরিবেশ, শিল্পীদের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞদের কাছ থেকে অভিনয় শেখার গল্প।

সাদা-কালো চলচ্চিত্রের যুগ থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েক দশক ধরে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নাসিমা খান। তাঁর মৃত্যুতে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে কাজ করা ঢাকার চলচ্চিত্রের প্রথম প্রজন্মের আরেকজন অভিনেত্রীর দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান হলো।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: