collected
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। আগের মতো হাতে জোর নেই, হাতও কাঁপে। তবে চোখের দৃষ্টি এখনো ভালো এবং মনের জোর অটুট। সেই শক্তিকে সম্বল করে প্রতিদিন ভোরে মাছ কাটার কাজে বসেন পাবনার নিয়ামত মোল্লা।
পাবনা শহরতলির চর বলরামপুর গ্রামের বাসিন্দা নিয়ামত মোল্লা। জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর বয়স ৯৮ বছর ১১ মাস। তবে নিয়ামতের দাবি, তাঁর বয়স ৯০ বছর। বয়স যা-ই হোক, জীবিকার প্রয়োজনে প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাঁকে দেখা যায় পাবনা জেলা শহরের কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল এলাকার মাসুম বাজারে।
বাজারে ছোট একটি ত্রিপলের নিচে বসে ক্রেতাদের মাছ কেটে দেন তিনি। এক কেজি ওজনের একটি মাছ কাটলে পান ২০ টাকা। ছোট মাছ কেজিপ্রতি কাটেন ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। সব মিলিয়ে দিনে তাঁর আয় হয় প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই আয় দিয়েই নিজের ও স্ত্রীর খাবার ও ওষুধের খরচ চালাতে হয় তাঁকে।
গত শুক্রবার সকালে মাসুম বাজারে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ২৫ থেকে ৩০ জন মাছ কাটার কাজে ব্যস্ত। তাঁদের অধিকাংশই তরুণ ও যুবক। তাঁদের মাঝেই নিজের ত্রিপল টাঙিয়ে বসে আছেন নিয়ামত। বয়সের কারণে তাঁর হাত কাঁপে এবং আগের মতো জোরও নেই। ফলে অনেক ক্রেতাই তাঁর কাছে মাছ কাটাতে চান না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর দু-একজন মাছ নিয়ে এলে ধীরেসুস্থে কাজটি করেন তিনি।
তবে বড় মাছ কাটতেই বেশি ভালো লাগে নিয়ামতের। তিনি জানান, জীবনে ৩০ থেকে ৪০ কেজি ওজনের মাছও কেটেছেন।
সিঙ্গা বাইপাস এলাকার অবসরপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা আজিজুর রহমান একটি রুই মাছ নিয়ে নিয়ামতের কাছে এসেছিলেন। নিয়ামতের মাছ কাটার দক্ষতা দেখে তিনি বলেন, এই বয়সেও চশমা ছাড়াই তিনি ভালো দেখতে পান এবং অন্যদের তুলনায় ভালো মাছ কাটেন। তাই সুযোগ পেলেই তাঁর কাছেই মাছ কাটাতে আসেন।
নিয়ামতের পাশে বসে মাছ কাটছিলেন মো. মিরাজুল বিশ্বাস। তাঁর ভাষ্য, নিয়ামতের মনের জোর অন্যদের চেয়ে বেশি। এখনো ভোরে বাজারে এসে নিজের ত্রিপল নিজেই টাঙিয়ে মাছ কাটার কাজে বসেন তিনি।
চার দশকের বেশি সময় ধরে মাছ কাটার কাজ
ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নদীতে মাছ ধরতেন নিয়ামত মোল্লা। প্রায় ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত মাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর শুরু করেন মাছ কাটার কাজ। পাবনা শহরের বড় বাজার, লাইব্রেরি বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে কাজ করার পর এখন মাসুম বাজারে বসেন তিনি। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে মাছ কাটাই তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন।
নিয়ামতের চার ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে ও মেয়ে মারা গেছেন। বাকি তিন ছেলের মধ্যে দুজন প্রহরীর কাজ করেন এবং একজন অটোরিকশা চালান। একই বাড়িতে থাকলেও সবার সংসার আলাদা। স্ত্রীকে নিয়ে আলাদা সংসার করেন নিয়ামত।
কথা বলতে বলতে একসময় থেমে যান তিনি। পরে নিজের জীবনের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ছেলেরা নিজেরাই ঠিকমতো সংসার চালাতে পারেন না। তাই বৃদ্ধ বয়সেও নিজের ও স্ত্রীর খরচ তাঁকেই বহন করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি ১৮ দিন অসুস্থ ছিলেন নিয়ামত। তখন জমানো কিছু টাকা খরচ করে চলেছেন। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর আবারও জীবিকার তাগিদে বাজারে ফিরে এসেছেন তিনি। বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে প্রতিদিনের এই সংগ্রামই এখন তাঁর জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ।