চলনবিলে বিন্না ফুলের ঝাড়ু বানিয়ে সংসার চালাচ্ছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩:০২ PM BST রাজশাহী জেলা ২৭ বার পঠিত
চলনবিলে বিন্না ফুলের ঝাড়ু বানিয়ে সংসার চালাচ্ছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা

collected

শরতের বিদায়লগ্নে সিরাজগঞ্জের চলনবিল এলাকার রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলার বিস্তীর্ণ পথপ্রান্তজুড়ে ফুটেছে শুভ্র বিন্না ফুল। মেঠোপথের দুপাশে বাতাসে দোল খাওয়া বিন্না ঘাসের ফুল এখন স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একদল নারীর জীবিকার উপকরণ হয়ে উঠেছে। বছরের এ সময়ে মাঠে কৃষিকাজের সুযোগ কম থাকায় তারা বিন্না ফুল সংগ্রহ করে ঝাড়ু তৈরি করছেন। পরে স্থানীয় হাট-বাজারে এসব ঝাড়ু বিক্রি করে পাওয়া অর্থ দিয়ে সংসারের খরচ মেটাচ্ছেন তারা।

রায়গঞ্জ উপজেলার বাসাইল ও পশ্চিম আটঘোরিয়া এলাকার জেসনা রানী মাহাতো, কুসুম রানী মাহাতো ও চন্দনা রানী ওঁরাও জানান, সংসারের খরচ চালাতে বছরের এ সময়টাতে তারা বিন্নার ফুল সংগ্রহ করে ঝাড়ু তৈরি করেন। এতে বাড়তি আয় হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের পরিবারের প্রয়োজনীয় ঝাড়ুও কিনতে হয় না।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মহাজনি ঋণের চাপে রয়েছে। পাশাপাশি অনেকে আগাম শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শরৎ ও হেমন্ত মৌসুমে এসব এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যায়। ধান রোপণ, পাকা ধান কাটার মৌসুম কিংবা ইটভাটায় কাঁচা ইট তৈরির মতো কাজ এ সময়ে বন্ধ থাকায় শ্রমজীবী পরিবারগুলো তীব্র অর্থসংকটে পড়ে। জীবনধারণের তাগিদে অনেকেই কম মজুরিতে আগাম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলায় ওঁরাও, মাহাতো, রাজবংশী, রবিদাস, কনকদাস, মুরারী, বসাইক ও সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস রয়েছে। সময়ের সঙ্গে এসব সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও জীবিকায়ও পরিবর্তন এসেছে।

একসময় এসব সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ বনাঞ্চলে শিয়াল, খরগোশ, কুঁইচা, বেজি ও কচ্ছপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় সেই ঐতিহ্যবাহী জীবিকার পথ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পরিবারের পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীরাও মাঠে-ঘাটে, গৃহস্থের বাড়িতে এবং ইটভাটায় দিনমজুরের কাজ শুরু করেন।

তাড়াশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী মিনতি রানী ওঁরাও বলেন, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে তাদের হাতে তেমন কোনো কাজ থাকে না। তাই অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে মাঠে বোরো ধান লাগানো কিংবা ধান কাটার কাজের জন্য এখন থেকেই অনেকের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছেন তারা। পরিবার বাঁচানোর তাগিদে দিনে মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় আগাম শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানান তিনি।

মিনতি রানী বলেন, গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে বিন্না ঘাসের ফুল দিয়ে ঝাড়ু তৈরি করে স্থানীয় বাজারে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করা যায়। এতে কাজের সংকটের এই সময়েও সংসারে বাড়তি কিছুটা আয় হয়।

সিরাজগঞ্জ জেলা আদিবাসী বহুমুখী উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি নির্মল মাহাতো বলেন, জেলার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষই অত্যন্ত দরিদ্র। পরিবার চালাতে নারী-পুরুষ উভয়কেই মাঠে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় শ্রমজীবী পরিবারগুলো সংসার চালাতে হিমশিম খায়।

তিনি বলেন, কম দামে আগাম শ্রম বিক্রির পাশাপাশি বিন্নার ফুল কুড়িয়ে ঝাড়ু তৈরি করেও তারা জীবিকা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। প্রতিদিন একজন নারী প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকার ঝাড়ু বিক্রি করেন। মৌসুমি কর্মসংস্থানের সংকটে বিন্না ফুল সংগ্রহ ও ঝাড়ু তৈরি তাই তাদের জন্য সাময়িক আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: