collected
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ইতোমধ্যে অন্তত ছয় বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। বন্ধ রয়েছে ক্লাসও।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। তবে দীর্ঘদিন আন্দোলন চললে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন আন্দোলনে থাকা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আন্দোলনের পেছনে কয়েকটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি যোগাযোগ, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ তৈরি, চুয়েটের বাইরে থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ এবং মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কোনো কারণ প্রকাশ না করেই আগের উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়া।
গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়টির যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। পরদিন তিনি দায়িত্ব নেন। কিন্তু ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রজ্ঞাপনে অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরানোর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। নতুন উপাচার্য ২৪ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে না গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে তিনি এখনো ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি।
উপাচার্য পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন জারির রাতেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করে উপাচার্য ভবনে তালা দেন। পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক আটকে সর্বাত্মক ‘শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন তাঁরা। পরে গণস্বাক্ষর, অবস্থান ও প্রশ্নযাত্রাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়।
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে পুরকৌশল, যন্ত্রকৌশল, পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ ছয় বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। আন্দোলনের কারণে সেসব পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। স্থগিত পরীক্ষার নতুন সূচিও এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
শিক্ষার্থীদের দাবি, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা শুনতেন। শিক্ষক হিসেবে এর আগেও তিনি চুয়েটের শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ পেতে সহযোগিতা করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন।
চুয়েটের শিক্ষক সমিতিও অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবুল হাসান বলেন, অল্প সময় কাজের সুযোগ দিয়ে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁকে সরানো তাঁদের কাছে অপমানজনক মনে হয়েছে।
চুয়েটের প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকও হঠাৎ উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, একজনকে নিয়োগ দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রকাশ্যে না এনে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কাম্য ছিল না। আগের উপাচার্যকে সরানোর পেছনে কোনো কারণ থাকলে তা প্রকাশ্যে জানানো উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে, চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর দাবি, আন্দোলনটি আওয়ামী লীগ-সুবিধাভোগী শিক্ষক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সক্রিয় শিবির কর্মীদের ইন্ধনে হচ্ছে। তবে আন্দোলনকারীরা এ ধরনের দাবির বিষয়ে নিজেদের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন।
চুয়েটের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানিয়েছেন, তিনি জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান, ডিন ও পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। শিক্ষার্থীদেরও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়েছেন তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দ্রুত ক্যাম্পাসে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন নতুন উপাচার্য।
চুয়েট আইন, ২০০৩ অনুযায়ী চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি। আইনের ১০(২) ধারায় প্রয়োজন মনে করলে আচার্যের যেকোনো সময় কারণ দর্শানো ছাড়াই উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তবে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন তুলেছেন, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কেন সরানো হলো।
চুয়েটের ১৮টি বিভাগে বর্তমানে ৬ হাজার ৩৬৭ জন শিক্ষার্থী ও ৩৬১ জন শিক্ষক রয়েছেন। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে চলমান বিরোধ দীর্ঘ হলে শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম আরও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।