দুই হাত ছাড়াই পায়ে লিখে পাঠদান, দুখু মিয়ার পাশে দাঁড়াল নরসিংদী জেলা প্রশাসন

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১২ অক্টোবর ২০২৬, ৪:৫২ PM BST ঢাকা ২৬৫ বার পঠিত
দুই হাত ছাড়াই পায়ে লিখে পাঠদান, দুখু মিয়ার পাশে দাঁড়াল নরসিংদী জেলা প্রশাসন

collected

জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। তবু শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন নরসিংদীর নগর পাঁচদোনা গ্রামের আলতাফ হোসেন ওরফে দুখু মিয়া। পায়ের দুই আঙুলের ফাঁকে চক ধরে ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে শিশুদের পাঠদান করেন তিনি। পা দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করেন, দেন নানা নির্দেশনা। তাঁর এই অদম্য জীবনসংগ্রাম ও শিক্ষাসেবার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এবার তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে নরসিংদী জেলা প্রশাসন।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সকালে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া দুখু মিয়ার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান। তাঁর সংগ্রামকে সম্মান জানাতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে বিতরণ করা হয় স্কুল ব্যাগ ও খেলার সামগ্রী। পরিবেশ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয় গাছের চারা। নতুন ব্যাগ ও চারা পেয়ে আনন্দে মেতে ওঠে শিক্ষার্থীরা।

পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসকের কাছে নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন দুখু মিয়া। তিনি জানান, চরম আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি বড় করা সম্ভব হচ্ছে না। এলাকার শিশুদের আরও ভালো শিক্ষার সুযোগ করে দিতে প্রাথমিক বিদ্যালয়টিকে একটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে চান তিনি।

দুখু মিয়ার স্বপ্নের কথা শুনে জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া তাঁকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, আলতাফ হোসেন দুখু মিয়া শুধু নরসিংদীর নন, পুরো দেশের গর্ব। তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নকে মাঝপথে থেমে যেতে দেওয়া হবে না। বিদ্যালয়টিকে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও দাপ্তরিক উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও সরকার সর্বাত্মকভাবে তাঁর পাশে থাকবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

নিজের প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো কোনো জেলা প্রশাসককে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন দুখু মিয়া। তিনি বলেন, স্কুল প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন জায়গায় সহযোগিতার জন্য গিয়েছেন। অনেকেই আশ্বাস দিলেও কেউ কখনো সরাসরি তাঁর বিদ্যালয়ে আসেননি। এবারই প্রথম সরকারি সহযোগিতা পেলেন, তাও জেলা প্রশাসক নিজে এসে দিয়েছেন। এতে উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নের বিষয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়েছেন তিনি।

দুখু মিয়ার জীবনসংগ্রাম শুরু হয় শৈশব থেকেই। জন্মের পর থেকেই তাঁর দুই হাত ছিল না। ছোটবেলায় মাদ্রাসায় ভর্তি হতে গেলে পা দিয়ে বই ধরতে পারবেন না—এমন কারণ দেখিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এতে দমে যাননি তিনি। বাবা-মায়ের সহায়তায় কলাপাতায় পাতিলের কালি ব্যবহার করে পা দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করেন। ধীরে ধীরে নিজের অধ্যবসায় ও দৃঢ় মনোবলে শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেন। ১৯৮৬ সালে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন তিনি।

উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে একাধিক সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ হারাতে হয় তাঁকে। তবে ঘরে বসে না থেকে ২০০৭ সালে পৈতৃক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘প্রতিভা দুখু মিয়া কিন্ডারগার্টেন’। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে প্রায় ১৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। পায়ের আঙুলে চক ধরে তাদের পাঠদান করে চলেছেন এই অদম্য শিক্ষক।

জেলা প্রশাসকের বিদ্যালয় পরিদর্শনকালে নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসমা জাহান সরকার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসান, পাঁচদোনা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি বাচ্চু মিয়া, সাধারণ সম্পাদক তারিক হোসেন রানাসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: