collected
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের আবাসন, পরিবহন, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও ক্যাম্পাসকে নারীবান্ধব করার মতো নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’। নির্বাচনে ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতেই জয় পান জোটটির প্রার্থীরা।
তবে নির্বাচনের এক বছর পর দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশির ভাগই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
গত বছরের ১৫ অক্টোবর চাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং ২৩ অক্টোবর নির্বাচিত নেতারা শপথ নেন। আগামী ২৩ অক্টোবর বর্তমান কমিটির মেয়াদ এক বছর পূর্ণ হবে।
ইশতেহারের ৩৩ দফা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ১৮টি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি, ১০টি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে এবং ৫টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। বাস্তবায়িত প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশির ভাগই তুলনামূলক ছোট পরিসরের বা নিয়মিত কার্যক্রমভিত্তিক।
এ ছাড়া চাকসুর সম্পাদক, সহসম্পাদক ও নির্বাহী সদস্যদের ব্যক্তিগত ইশতেহারের ২২২টি অঙ্গীকার পর্যালোচনায় ১০৭টি বাস্তবায়িত হয়নি, ৬০টি পুরোপুরি বাস্তবায়িত এবং ৫৫টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে।
আবাসন ও পরিবহনে বড় অগ্রগতি নেই
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের অন্যতম সমস্যা আবাসনসংকট। বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান না। নির্বাচনের আগে বিদ্যমান হল সংস্কার ও সম্প্রসারণ, নতুন ভবন নির্মাণ এবং অন্তত ১০ শতাংশ আসন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
তবে এক বছরে এসব প্রতিশ্রুতির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন হয়নি। তিনটি হলের বর্ধিত অংশ সংস্কারের মাধ্যমে ১৯৭ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পরিবহন খাতেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। শাটল ট্রেনের সংখ্যা ও বগি বাড়ানো, প্ল্যাটফর্ম আধুনিকায়ন, দ্বিতীয় রেললাইন নির্মাণের উদ্যোগ এবং শাটল ট্র্যাকার অ্যাপ চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল। একটি শাটলের সব বগি সংস্কার এবং আরেকটির বগি পরিবর্তন করা হলেও শাটলের সংখ্যা বাড়েনি।
শহরের বিভিন্ন এলাকা ও আশপাশের উপজেলা থেকে বাস সার্ভিস চালুর প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি।
ক্রিমিনোলজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী গালিব কবীর বলেন, আবাসনসংকট দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাঁর ভাষ্য, শাটলের সময়সূচিতে সমস্যা রয়েছে, শহরগামী বাসের সংকটও আছে। মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক ও ওষুধের ঘাটতিও রয়েছে।
ভিপির দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগ্রগতি
চাকসুর ভিপি মো. ইব্রাহীম হোসেন অবশ্য দাবি করেছেন, আবাসন ও পরিবহন ছাড়া ৩৩ দফার অধিকাংশ প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন শাটল ট্রেন বা বাস যুক্ত করা সম্ভব হয়নি এবং আবাসনও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ানো যায়নি। তবে পুরোনো শাটল সংস্কার, ১৪টি ইকো কার চালু, রাতে বাসের ব্যবস্থা এবং কয়েকটি হল সংস্কারের মাধ্যমে শতাধিক শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জিএস সাঈদ বিন হাবিব বলেন, শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা প্রশাসনের কাছে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁরা সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষার্থীরা যে সমস্যার কথা জানিয়েছেন, সেগুলোর সমাধানে তাঁরা কাজ করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
প্রশাসনের সহযোগিতার কথা চাকসুর
ছাত্র উপদেষ্টা ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাকসুকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। বিভিন্ন দপ্তর ও কর্মকর্তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দিয়েছেন। বড় ধরনের অসহযোগিতার কোনো ঘটনা তাঁর জানা নেই।
চাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর চাকসুকে সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছে।
আবাসনসংকটের মতো বড় সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) জমা দেওয়া হয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার আরেকটি ডিপিপি শিগগিরই জমা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের জন্য ১০ তলাবিশিষ্ট পাঁচটি হল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।
চাকসুর বাজেট প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, চাকসু প্রায় ৮ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে পুরো অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে চাকসুর চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।
বিরোধী সংগঠনগুলোর ভিন্ন মূল্যায়ন
চাকসুর কার্যক্রম নিয়ে বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর মূল্যায়ন ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, গত এক বছরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেনি। বিশেষ করে আবাসন, নিরাপদ খাবার ও নিরাপদ ক্যাম্পাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চাকসু প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি বলে তাঁর অভিযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক সুদর্শন চাকমার মতে, চাকসুর কিছু দৃশ্যমান কার্যক্রম থাকলেও মৌলিক সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। আবাসনসংকট সমাধানে কার্যকর নীতি বা কর্মপরিকল্পনা দেখা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্য প্যানেল থেকে একমাত্র নির্বাচিত প্রার্থী হিসেবে এজিএস পদে জয়ী আইয়ুবুর রহমান অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই তাঁকে চাকসুর কার্যক্রমে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তাঁর দাবি, বিভিন্ন কর্মসূচি বা বিবৃতি দেওয়ার আগে তাঁর মতামত নেওয়া হয়নি এবং চাকসুর কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়েও তাঁকে জানানো হয়নি।
তবে এই অভিযোগ নাকচ করেছেন ভিপি ইব্রাহীম হোসেন ও জিএস সাঈদ বিন হাবিব। তাঁদের দাবি, চাকসুর কোনো প্রতিনিধিকে কোণঠাসা করার সুযোগ নেই এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করছেন।
পরবর্তী চাকসু নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে চাকসু নির্বাচনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডারে যুক্ত করে নিয়মিত নির্বাচন আয়োজনের কথাও ছিল। কিন্তু বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে এলেও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো ঘোষণা নেই।
ভিপি ইব্রাহীম হোসেন বলেন, প্রথম কার্যনির্বাহী সভা থেকেই তাঁরা একাডেমিক ক্যালেন্ডারে চাকসু নির্বাচন যুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও প্রস্তুতি শুরুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
চাকসুর সভাপতি ও উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে যথাসময়ে নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা থাকবে।
সপ্তম চাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন বলেন, বর্তমান গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক বছর শেষে সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে। নতুন নির্বাচন না হলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা তুলে ধরার নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোও থাকবে না।