Photo Collected
মাত্র ১৬ বছর বয়সে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন গণিতে অসাধারণ মেধাবী এক কিশোর। কয়েক দশক পর সেই টেড ক্যাকজিনস্কিই পরিচিত হন ‘ইউনাবোম্বার’ নামে। ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রায় দুই দশকে চালানো ১৬টি বোমা হামলায় নিহত হন তিনজন, আহত হন আরও ২৩ জন।
ক্যাকজিনস্কির জীবনের সেই অন্ধকার অধ্যায় এবার পর্দায় তুলে এনেছে নেটফ্লিক্সের চলচ্চিত্র ‘ইউনাবোম্বার’। ছবিটি পরিচালনা করেছেন জানুস মেটজ। তরুণ টেড ক্যাকজিনস্কির চরিত্রে অভিনয় করেছেন জ্যাকব ট্রেম্বলে। তাঁর বিপরীতে হার্ভার্ডের অধ্যাপক হেনরি মারের চরিত্রে রাসেল ক্রো, এফবিআই কর্মকর্তা জোয়ান মিলারের চরিত্রে শেইলিন উডলি এবং একাডেমিক সহযোগী ক্রিস্টিয়ানা মরগানের চরিত্রে রয়েছেন অ্যানাবেল ওয়ালিস।
ছবির গল্পের বড় অংশ ঘুরেছে হার্ভার্ডে টেডের সময়কাল এবং সেখানে তাঁর অংশ নেওয়া মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষাকে ঘিরে। তবে নির্মাতারা স্পষ্ট করেছেন, এটি টেড ক্যাকজিনস্কির পূর্ণাঙ্গ জীবনী নয়। বরং তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অস্বস্তিকর সময়কে সামনে রেখে পরবর্তী সময়ের ‘ইউনাবোম্বার’কে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
১৯৪২ সালে শিকাগোতে জন্ম নেওয়া ক্যাকজিনস্কির ছোটবেলা থেকেই গণিতে অসাধারণ দক্ষতা ছিল। ১৬ বছর বয়সে হার্ভার্ডে ভর্তি হওয়ার পর মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলেতে গণিতের অধ্যাপক হিসেবেও যোগ দেন। তবে ১৯৬৯ সালে সেই চাকরি ছেড়ে ধীরে ধীরে সমাজ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি।
পরবর্তীতে মন্টানার লিংকনের কাছে প্রত্যন্ত এলাকায় একটি ছোট কেবিনে বসবাস শুরু করেন ক্যাকজিনস্কি। বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহবিহীন সেই জীবনেই আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পসভ্যতার প্রতি তাঁর বিরোধিতা ক্রমশ তীব্র হতে থাকে। এর কয়েক বছর পর শুরু হয় তাঁর বোমা হামলার অধ্যায়।
১৯৭৮ সালে প্রথম পরিচিত হামলায় হাতে তৈরি একটি বিস্ফোরক ডাকযোগে নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের কাছে পাঠানো হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়, বিমান সংস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁর হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। এফবিআই তদন্তের সাংকেতিক নাম দিয়েছিল ‘ইউনাবম’, যা পরে সংবাদমাধ্যমের ব্যবহারে ‘ইউনাবোম্বার’ নামে পরিচিতি পায়।
১৯৯৫ সালে তদন্তে আসে বড় মোড়। ক্যাকজিনস্কি ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ ও ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এ প্রকাশের জন্য প্রায় ৩৫ হাজার শব্দের একটি লেখা পাঠান। ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি অ্যান্ড ইটস ফিউচার’ নামের সেই লেখায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ ও শিল্পসভ্যতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান তুলে ধরা হয়।
লেখাটি প্রকাশের পর ক্যাকজিনস্কির ভাই ডেভিডের স্ত্রী লিন্ডা প্যাট্রিক ভাষা ও ভাবনার কিছু মিল খুঁজে পান। পরে ডেভিডও তাঁর ভাইয়ের পুরোনো লেখার সঙ্গে ইশতেহারের মিল লক্ষ্য করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি এফবিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এই সূত্রই তদন্তকারীদের ক্যাকজিনস্কির কাছে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘ইউনাবোম্বার’ সিনেমায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে হার্ভার্ডের সময়কাল। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময় তিনি অধ্যাপক হেনরি মারের তত্ত্বাবধানে কিছু মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। মারের সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন ক্রিস্টিয়ানা মরগান। তবে এসব পরীক্ষার ঠিক কী প্রভাব ক্যাকজিনস্কির পরবর্তী জীবনে পড়েছিল, তা নিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। নির্মাতারাও পরীক্ষাগুলোকে তাঁর পরবর্তী কর্মকাণ্ডের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখাননি।
১৯৯৬ সালের ৩ এপ্রিল মন্টানার প্রত্যন্ত এলাকায় ক্যাকজিনস্কির কেবিন ঘিরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে এফবিআই। তল্লাশিতে বোমা তৈরির উপকরণ, টাইপরাইটার, হাতে লেখা নোট ও একটি তৈরি বোমা উদ্ধার করা হয়। পরে আদালতে অপরাধ স্বীকার করলে তাঁকে প্যারোলে মুক্তির সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে ৮১ বছর বয়সে কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হয়।
তরুণ ক্যাকজিনস্কির চরিত্রে অভিনয় করতে জ্যাকব ট্রেম্বলে তাঁর গ্রেপ্তারের পরের জিজ্ঞাসাবাদের রেকর্ড, ভিডিও ও শরীরী ভাষা পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিশেষ করে ক্যাকজিনস্কির কঠোর ও কিছুটা কাঠখোট্টা শরীরী ভঙ্গি চরিত্রটি নির্মাণে তাঁকে সাহায্য করেছে। তবে তরুণ বয়সের ক্যাকজিনস্কিকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে নিজের অভিনয়শৈলীও ব্যবহার করেছেন তিনি।
হার্ভার্ডের মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার দৃশ্যগুলোও ট্রেম্বলের জন্য ছিল চ্যালেঞ্জিং। চরিত্রের অস্বস্তি ও মানসিক চাপকে অভিনয়ের অংশ করে সেই সময়ের তরুণ ক্যাকজিনস্কিকে পর্দায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন অভিনেতা। ফলে ‘ইউনাবোম্বার’ শুধু এক অপরাধীর গল্প নয়; বরং একজন অসাধারণ মেধাবী তরুণ কীভাবে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবনের দিকে এগিয়ে গেলেন, সেই অন্ধকার যাত্রার একটি নির্দিষ্ট অধ্যায়কে পর্দায় অনুসন্ধান করেছে।