‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি থেকে ফেলা হয়েছিল নাসিমা খানকে

Pinky Saha Pinky Saha ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১:৫৫ PM BST ৩৩৪ বার পঠিত
‘কার বউ’ ছবির শুটিংয়ে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ি থেকে ফেলা হয়েছিল নাসিমা খানকে

সংগৃহীত ছবি

বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খানের অভিনয়জীবনে রয়েছে নানা অভিজ্ঞতা ও স্মরণীয় ঘটনা। এর মধ্যে অন্যতম ১৯৬৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কার বউ’ সিনেমার শুটিংয়ে সিঁড়ি থেকে পড়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার ঘটনা। স্বামীর দুর্ঘটনার খবর শুনে সিঁড়ির দিকে দৌড়ে যাওয়ার দৃশ্য ধারণের সময় পরিচালক নজরুল ইসলাম তাঁকে আচমকা ধাক্কা দেন। প্রস্তুতি ছাড়াই ধাক্কা খেয়ে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ে যান অভিনেত্রী। দৃশ্যটি ক্যামেরায় ভালোভাবে ধারণ হওয়ায় পেছন থেকে হাততালি শোনা গেলেও ব্যথায় কাতর হয়ে পড়েন তিনি। পরে তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিন দিন পর্যন্ত ঠিকমতো নড়াচড়া করতে পারেননি।

১৯৯০ সালে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত আত্মকথনে নাসিমা খান এই ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেছিলেন। চলচ্চিত্র সমালোচক মাহমুদা চৌধুরীর অনুলিখিত সেই স্মৃতিচারণা পরে বাংলা মুভি ডেটাবেজে পুনঃপ্রকাশিত হয়। সেখানে উঠে এসেছে সে সময়ের চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিবেশ, অভিনয়শিল্পীদের ঝুঁকি নিয়ে দৃশ্য ধারণ এবং নির্মাতা-শিল্পীদের পারস্পরিক সম্পর্কের নানা দিক।

‘কার বউ’ ছিল বাংলাদেশের প্রথম দিককার হাসির চলচ্চিত্রগুলোর একটি। ছবিতে নাসিমা খান ছিলেন একমাত্র নায়িকা। তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন হারুন, গোলাম মুস্তাফা ও সুভাষ দত্তসহ একাধিক অভিনেতা। ছবির গল্পে বিয়ের দিন দুর্ঘটনার পর নায়িকা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হন এবং যাঁকেই দেখেন, তাঁকেই নিজের স্বামী মনে করতে থাকেন। এমন অদ্ভুত পরিস্থিতি থেকেই তৈরি হয় ছবির নানা হাস্যরসাত্মক ঘটনা।

সেই সময় শুটিংয়ে বিপজ্জনক দৃশ্যের জন্য বডি ডাবল বা ডামি ব্যবহারের সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে ঘোড়ায় চড়া, সাইকেল বা মোটরগাড়ি চালানো কিংবা সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার মতো দৃশ্যও অনেক সময় শিল্পীদের নিজেরাই করতে হতো। নাসিমা খানের স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, সিঁড়ি থেকে পড়ে যাওয়ার দৃশ্যটি ধারণের আগে তাঁকে ধাক্কা দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়নি। অপ্রত্যাশিতভাবে পড়ে গিয়ে শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি ক্ষুব্ধ ও অভিমানী হয়ে পড়েছিলেন তিনি।

তবে পরিচালকের ওপর ক্ষোভ থাকলেও নাসিমা খানের স্মৃতিতে উঠে এসেছে সেই সময়ের চলচ্চিত্রাঙ্গনের আন্তরিক সম্পর্কের কথাও। পরিচালক নজরুল ইসলামকে তিনি ‘নজু ভাই’ বলে ডাকতেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন শিল্পীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার চেয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহযোগিতার গুরুত্ব ছিল বেশি। কে পর্দায় বেশি গুরুত্ব পেলেন, তা নিয়ে ভাবনার চেয়ে চরিত্রটি ভালোভাবে ফুটিয়ে তোলার দিকেই মনোযোগ দিতেন তাঁরা।

অভিনয়জীবনের শুরুতে ‘সূর্যস্নান’ সিনেমার শুটিংয়েও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন নাসিমা খান। আনোয়ার হোসেনের বিপরীতে আবেগঘন একটি দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে বারবার শট দিতে হয়েছিল তাঁকে। একপর্যায়ে আনোয়ার হোসেন নায়িকা বদলে ফেলার পরামর্শ দিলেও পরিচালক সালাহউদ্দিন তাঁকে বুঝিয়ে অভিনয় করান। শেষ পর্যন্ত একাধিক চেষ্টার পর দৃশ্যটি ধারণ করা সম্ভব হয়। ছবিটির সাফল্য তাঁর অভিনয়ের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।

১৯৫৯ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে ছোট চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক হয় নাসিমা খানের। পরে ‘যে নদী মরু পথে’, ‘সূর্যস্নান’, ‘ধারাপাত’, ‘কার বউ’, ‘উজালা’, ‘বেগানা’ ও ‘দুই ভাই’সহ বহু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ঢাকার পাশাপাশি লাহোরের উর্দু চলচ্চিত্রেও পরিচিতি পেয়েছিলেন এই অভিনেত্রী।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেলেও জীবনের শেষদিকে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন নাসিমা খান। ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশায় ছিলেন তিনি। সাত দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ১১ অক্টোবর সন্ধ্যায় ৮২ বছর বয়সে মারা যান এই অভিনেত্রী। তাঁর মৃত্যুর পর পুরোনো স্মৃতিচারণা ও শুটিংয়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে তাঁর দীর্ঘ পথচলা।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: