ব্রেকিং

কেন বাড়ছে মানুষের অসহিষ্ণুতা, অপরাধ ও গণপিটুনির প্রবণতা?

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:৫০ PM BST ৩৪ বার পঠিত
কেন বাড়ছে মানুষের অসহিষ্ণুতা, অপরাধ ও গণপিটুনির প্রবণতা?

collected

বিশেষ প্রতিবেদন ॥ সামান্য বিরোধ, ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা গুজবকে কেন্দ্র করে মারধর থেকে হত্যাকাণ্ড—সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন কিছু ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, অপরাধের অভিযোগ, ছিনতাই কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যকে কেন্দ্র করেও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।

এসব ঘটনার প্রতিটি কারণ এক নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত সম্পৃক্ততা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা—এসব বিষয় সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব

সমাজে আয় ও সম্পদের বৈষম্য, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয় মানুষের মধ্যে হতাশা ও চাপ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানসিক চাপ বাড়ানোর একটি কারণ হতে পারে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের একমাত্র কারণ হিসেবে অর্থনৈতিক বৈষম্য বা বেকারত্বকে চিহ্নিত করা যায় না। অপরাধের পেছনে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক—একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি নতুন নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসার ঘাটতিও বড়।

তবে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত প্রত্যেক ব্যক্তি সহিংস বা অপরাধপ্রবণ—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, সামাজিক সহায়তা এবং সময়মতো চিকিৎসার অভাবকে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হয়।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী চাপ, উদ্বেগ, হতাশা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের বিস্তার

ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের যোগাযোগ সহজ করেছে। একই সঙ্গে যাচাই না করা তথ্য, গুজব, ঘৃণামূলক বক্তব্য ও সহিংসতার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাও হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো, ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে দেখা এবং অনলাইনে আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অপরাধের বিচার বনাম ‘তাৎক্ষণিক বিচার’

অপরাধের অভিযোগ উঠলেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আইনের শাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনাও দেখা গেছে, যেখানে কোনো অপরাধের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্তের বাড়িঘর বা সম্পত্তিতে হামলা হয়েছে।

এর সাম্প্রতিক উদাহরণ পাবনার ঘটনা। ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দুইজনকে গ্রেপ্তারের পর ১৮ সেপ্টেম্বর ক্ষুব্ধ জনতা প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। পুলিশ জানিয়েছে, তারা পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে পারলেও বিপুল জনতার কারণে ভবনের কাঠামোগত ক্ষতি ঠেকাতে পারেনি। পরদিনও বাড়িটিতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

এ ধরনের ঘটনায় জনসাধারণের ক্ষোভের কারণ বোধগম্য হলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আলাদা একটি অপরাধ ও সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্তের পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা বা সম্পত্তি ধ্বংসের মাধ্যমে তাদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

ছোট ঘটনা থেকে বড় সহিংসতা

সামাজিক সহনশীলতা কমে গেলে ছোটখাটো বিরোধও দ্রুত বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। রাস্তায় সামান্য ধাক্কা, পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত অপমানের মতো বিষয় থেকে মারামারি ও হত্যার ঘটনা ঘটার খবর মাঝেমধ্যেই সামনে আসে।

এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক বন্ধন এবং বিরোধ মীমাংসার স্থানীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো কার্যকর থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিরোধ যত দ্রুত শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা যায়, সংঘাতের মাত্রা তত কমানো সম্ভব।

সহনশীল সমাজ গঠনে কী প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, অসহিষ্ণুতা কমাতে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—সব ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।

শিশু ও তরুণদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা, যুক্তিবোধ, মতভিন্নতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং সংঘাত শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখা। অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; আর নাগরিকের দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, গুজব এড়িয়ে চলা এবং আইন নিজের হাতে না নেওয়া।

একটি সহনশীল সমাজ শুধু অপরাধ কমানোর মাধ্যমে তৈরি হয় না। সেখানে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মতভিন্নতা মেনে নেওয়ার সংস্কৃতিও থাকতে হয়। বর্তমান বাস্তবতায় এসব ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করাই সামাজিক উত্তেজনা ও সহিংসতা কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: