খলনায়ক চরিত্রে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুবার্ষিকী

Pinky Saha Pinky Saha ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৯ AM BST ২৭ বার পঠিত
খলনায়ক চরিত্রে দর্শকের মনে জায়গা করে নেওয়া সাদেক বাচ্চুর মৃত্যুবার্ষিকী

ছবি: সংগৃহীত

পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনের পাশাপাশি ঢালিউড সিনেমায়ও নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন অভিনেতা সাদেক বাচ্চু। খলনায়ক চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পান। ১৯৯০-এর দশকে এহতেশামের ‘চাঁদনী’ সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয়ের পর তাঁর জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। পরে একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নিজেকে বাংলা সিনেমার পরিচিত মুখে পরিণত করেন তিনি।

সাদেক বাচ্চুর প্রকৃত নাম মাহবুব আহমেদ। ১৯৫৫ সালের ১ জানুয়ারি চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে বাংলাদেশ ডাক বিভাগে চাকরি করেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে, ১৯৭০ সালে ডাক বিভাগে যোগ দেন। তাঁর বাবা ডাক বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক পরিস্থিতিতে সাদেক বাচ্চুর চাকরিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০১৩ সালে অবসর নেন তিনি।

অভিনয়ে তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনের মাধ্যমে। পরে চলচ্চিত্রে এসে ‘রামের সুমতি’ সিনেমায় পার্শ্বনায়কের চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর ‘চাঁদনী’সহ বিভিন্ন সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের নজর কাড়েন। ধীরে ধীরে খল অভিনেতা হিসেবেই তাঁর পরিচিতি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

তবে এই পরিচিতির সঙ্গে কিছুটা আক্ষেপও ছিল সাদেক বাচ্চুর। খল চরিত্রে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর পরিচালকেরা তাঁকে বেশির ভাগ সময় একই ধরনের চরিত্রেই ভাবতেন। ফলে অভিনয়ের বৈচিত্র্য দেখানোর সুযোগ সব সময় পাননি তিনি। এক সাক্ষাৎকারে সাদেক বাচ্চু জানিয়েছিলেন, দর্শকেরা অনেক সময় অভিনেতাকে তাঁর অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। তবে বিষয়টিকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখতেন না। বরং দর্শকেরা চরিত্র মনে রাখছেন—এটিকেও এক ধরনের ভালোবাসা হিসেবে দেখতেন তিনি।

খল চরিত্রে তাঁর অভিনয়ের প্রভাব যে কতটা গভীর ছিল, বাস্তব জীবনের একটি ঘটনাই তার প্রমাণ। একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে রাজাকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সাদেক বাচ্চু। নাটকের একটি দৃশ্যে তাঁর চরিত্রকে নির্মমভাবে একজনকে হত্যা করতে দেখা যায়। সেই পর্ব প্রচারের পরদিন বোনকে আনতে ট্রেনে জামালপুরে গিয়েছিলেন তিনি। স্টেশনে তাঁকে দেখে কয়েকজন দর্শক বাদামের খোসা ও পাথর ছুড়ে মারেন। পরে তাঁদের বোঝাতে হয়, সেটি ছিল কেবল অভিনয়।

চলচ্চিত্রে কাজের পাশাপাশি বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় হতাশাও প্রকাশ করেছিলেন সাদেক বাচ্চু। তাঁর মতে, সিনিয়র শিল্পীদের জন্য উপযুক্ত চরিত্র তৈরি ও তাঁদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর প্রবণতা দেশে কম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়শিল্পীদের প্রয়োজনীয়তা কমে যায়—যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে পুরোনো ও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অভিজ্ঞতা ও আধুনিকতার সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাদেক বাচ্চুর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘জীবন নদীর তীরে’, ‘জোর করে ভালোবাসা হয় না’, ‘তোমার মাঝে আমি’, ‘ঢাকা টু বোম্বে’, ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘এক জবান’, ‘আমার স্বপ্ন আমার সংসার’, ‘মন বসে না পড়ার টেবিলে’, ‘বধূবরণ’, ‘ময়দান’, ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ‘আনন্দ অশ্রু’, ‘প্রিয়জন’ ও ‘সুজন সখী’সহ আরও অনেক সিনেমা।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করলেও খলনায়ক হিসেবেই দর্শকের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পান সাদেক বাচ্চু। তাঁর অভিনীত বিভিন্ন চরিত্র আজও বাংলা সিনেমার দর্শকদের স্মৃতিতে রয়েছে।

২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান সাদেক বাচ্চু। মৃত্যুর পরও তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র ও চরিত্রগুলো তাঁকে দর্শকের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা চলচ্চিত্রে এই শক্তিমান অভিনেতার অবদান নতুন করে স্মরণ করছেন তাঁর সহকর্মী ও ভক্তরা।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: