মাকে সঙ্গে রাখতে নারাজ ছেলে, সাঁথিয়ায় ইউএনওর কার্যালয়ে আবেগঘন শুনানি

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১:১০ PM BST রাজশাহী ২২ বার পঠিত
মাকে সঙ্গে রাখতে নারাজ ছেলে, সাঁথিয়ায় ইউএনওর কার্যালয়ে আবেগঘন শুনানি

collected

আমি তোর সাথে যাবোরে, ও সোনার বাজানরে। আমি আর কিছু চাই না’—ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে এভাবেই আকুতি জানাচ্ছিলেন ৫৫ বছর বয়সী অসুস্থ মুন্নি খাতুন। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর ছেলে সাগর হোসেন (৩২)। তবে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি নন তিনি। সাগরের বক্তব্য, মায়ের ভরণপোষণের খরচ দেবেন, কিন্তু তাঁকে নিজের সঙ্গে রাখা সম্ভব নয়।

গত বৃহস্পতিবার পাবনার সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে মা-ছেলের বিরোধ নিয়ে শুনানির সময় এ ঘটনা ঘটে। শুনানির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় ইউএনও সেলিম আহমেদ ছেলেকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তবে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন সাগর। একপর্যায়ে তিনি বলেন, মাকে নিজের সঙ্গে থাকতে দিলে আত্মহত্যা করা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় থাকবে না।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মা-ছেলের বিরোধের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি ও অভিমান। সাগরের বিয়ের পর থেকে তাঁর স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। পরে এ বিরোধে সাগরের বোনও মায়ের পক্ষ নিয়ে জড়িয়ে পড়েন। এতে পারিবারিক অশান্তি আরও বাড়ে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে কয়েক দফা সমাধানের চেষ্টা করা হলেও বিরোধ মেটেনি।

সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রাম পুলিশ। তাঁর বাবা সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। বোনের বিয়ে হয়েছে। বর্তমানে মুন্নি খাতুন স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়িতে ছেলের সঙ্গে থাকেন না; থাকেন মেয়ের বাড়িতে। মা ও ছেলে দুজনেরই কিছু জমিজমা রয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, মুন্নি খাতুনের নিজের নামেও প্রায় ১০ লাখ টাকার জমি আছে। তাঁদের মতে, এ বিরোধের মূল কারণ আর্থিক অনটন নয়; বরং একসঙ্গে থাকা নিয়ে পারিবারিক টানাপোড়েন।

নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান বলেন, মা ও ছেলের বিরোধ মেটাতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছেন। তবে দুই পক্ষেরই কিছু ভুল রয়েছে। ইউএনওর কার্যালয়ে শুনানির পর শুক্রবারও তিনি সাগরের সঙ্গে কথা বলেছেন।

চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, সাগর তাঁকে জানিয়েছেন, বিয়ের পর থেকেই তাঁর স্ত্রী ও মায়ের মধ্যে বিরোধ চলছিল। একপর্যায়ে সাগরের বোন মায়ের পক্ষ নিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়েন। এসব ঘটনার পর মুন্নি খাতুন বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অভিযোগ করার পর সাগরকে ডেকে নিয়ে মারধর করা হয়েছিল বলে তিনি জানিয়েছেন। এরপর থেকে মায়ের প্রতি তাঁর অভিমান আরও বেড়ে যায়।

হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মায়েরও কিছু ভুল থাকতে পারে; কিন্তু একমাত্র ছেলে হয়ে মাকে নিজের কাছে রাখতে না চাওয়াটা মেনে নেওয়া যায় না। আমি সাগরকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। আশা করছি, তাঁকে রাজি করিয়ে বিষয়টির সমাধান করতে পারব।’

সাগরের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে মায়ের খরচ আমি দেব। কিন্তু আমার সঙ্গে রাখা সম্ভব না।’

ইউএনও সেলিম আহমেদ জানান, প্রায় এক সপ্তাহ আগে মুন্নি খাতুন ও সাগরের মামা তাঁর কাছে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে মুন্নি খাতুন অভিযোগ করেন, ছেলে তাঁকে বাড়িতে রাখেন না এবং ভরণপোষণও দেন না। অসুস্থ এই মা জীবনের বাকি সময় ছেলের সঙ্গে থাকতে চান। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাগরকে শুনানিতে হাজির হওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়।

ইউএনও বলেন, শুনানিতে সাগরকে মা-বাবার ভরণপোষণসংক্রান্ত আইন সম্পর্কে বোঝানো হয়েছে। মানবিক ও ধর্মীয় দিক থেকেও তাঁকে মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করা হয়। দীর্ঘ সময় বোঝানোর পরও সাগর মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে রাজি হননি। তবে তিনি মায়ের যাবতীয় খরচ দিতে রাজি হয়েছেন।

সেলিম আহমেদ বলেন, তাঁর পর্যবেক্ষণে এটি মূলত আর্থিক সমস্যা নয়, মানসিক সমস্যা। মায়ের কাছে ভরণপোষণের টাকা বা আর্থিক সুবিধা মুখ্য নয়; তিনি ছেলের সঙ্গে থাকতে চান। অন্যদিকে ছেলে মায়ের খরচ দিতে রাজি হলেও তাঁকে সঙ্গে রাখতে চান না। সাগর কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা বারবার জানতে চাওয়া হলেও তিনি স্পষ্ট করে কারণ জানাননি।

ইউএনও আরও বলেন, মুন্নি খাতুন একাধিক সরকারি ভাতা ও সহায়তা পান। আর্থিক অসচ্ছলতা থাকলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা যেত। কিন্তু এখানে মায়ের মূল চাওয়া ছেলের সঙ্গে থাকা। শুনানি শেষে সাগর মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন বলেও জানান তিনি। তাই মায়ের প্রতি তাঁর কোনো অনুভূতি নেই, এমনটা বলা যায় না। তবে মাকে সঙ্গে রাখতে না চাওয়ার পেছনে আরও কোনো ঘটনা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

আপাতত সাগরের ওপর আর চাপ না দিয়ে কিছুদিন পর মা-ছেলেকে আবারও শুনানিতে ডাকার পরিকল্পনা রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাঁদের বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও সেলিম আহমেদ।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: