ছবি: সংগৃহীত
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সুচিত্রা সেন, উত্তমকুমার ও সুপ্রিয়া দেবী তিনটি উজ্জ্বল নাম। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা গল্প ও কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে উত্তমকুমারকে কেন্দ্র করে সুচিত্রা ও সুপ্রিয়ার সম্পর্ককে অনেক সময় ত্রিকোণ প্রেমের সরল সমীকরণে দেখা হয়েছে। তবে তাঁদের ঘনিষ্ঠজনদের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে আরও জটিল ও মানবিক এক সম্পর্কের ছবি, যেখানে ছিল বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, অভিমান ও পারস্পরিক বোঝাপড়া।
উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেনের সঙ্গে একাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন অভিনেতা অনুপ কুমার। তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে তাঁর স্মৃতিতে ঈর্ষা বা বিরোধের চেয়ে বন্ধুত্বের দিকটিই বেশি স্পষ্ট। অনুপ কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, দুজনের মধ্যে এমন বন্ধুত্ব ছিল যে তাঁদের ব্যক্তিগত অভিমান বা ইগো কখনো প্রকাশ্যে আসতে দেখেননি তিনি।
সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে উত্তমকুমারের প্রথম ছবি ছিল ‘বসু পরিবার’। অন্যদিকে পরিচালক নির্মল দের সঙ্গে কাজের সূত্রে পরিচয় হয় সুচিত্রা সেনের সঙ্গেও। তখন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির শুটিং চলছিল। নির্মল দে-ই সুপ্রিয়ার সঙ্গে সুচিত্রার পরিচয় করিয়ে দেন।
পরবর্তী সময়ে সেই পরিচয় গভীর সম্পর্কের রূপ নেয়। সুচিত্রা সেনকে সুপ্রিয়া দেবী ‘রমাদি’ বলে ডাকতেন এবং তাঁর প্রতি ছিল গভীর শ্রদ্ধা। একইভাবে সুচিত্রার কাছেও সুপ্রিয়া ছিলেন পছন্দের একজন মানুষ। ফলে উত্তমকুমারকে ঘিরে দুই অভিনেত্রীর সম্পর্ককে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা ঈর্ষার দৃষ্টিতে দেখলে তাঁদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার অনেকটাই অদেখা থেকে যায়।
এমনই একটি স্মৃতি একসময় শুনিয়েছিলেন সুপ্রিয়া দেবী। কলকাতায় এক বৃষ্টিভেজা দিনে ময়রার স্ট্রিটের বাড়িতে ফোন করেছিলেন সুচিত্রা। ফোন ধরেছিলেন সুপ্রিয়া। উত্তমকুমার কোথায় জানতে চাইলে তিনি জানান, উত্তম শুটিংয়ে গেছেন।
উত্তমকে না পেয়ে সুচিত্রা মজা করে বলেছিলেন, তাঁর তখন উত্তমকে খুব চুমু খেতে ইচ্ছে করছিল। বিষয়টিতে সুপ্রিয়া বিচলিত না হয়ে বরং উত্তম শুটিং শেষে সুচিত্রার বাড়িতে গেলে ভালো হবে বলে জানান।
সুপ্রিয়ার এমন স্বাভাবিক আচরণে বরং অবাক হয়েছিলেন সুচিত্রা। কেন তিনি বিষয়টি এত সহজভাবে নিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সুপ্রিয়ার উত্তর ছিল—তিনি সুচিত্রাকে খুব ভালো করে চেনেন।
এই স্মৃতিচারণই যেন তিন কিংবদন্তির সম্পর্কের প্রচলিত গল্পের বাইরে অন্য এক ছবি তুলে ধরে। সেখানে উত্তমকুমারকে ঘিরে সুচিত্রা ও সুপ্রিয়ার মধ্যে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না; বরং একে অপরের প্রতি ছিল আস্থা, শ্রদ্ধা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীর বোঝাপড়া।
তিনজনের কেউই আজ বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁদের অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে দর্শকের আগ্রহ এখনো অটুট। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তাঁদের সম্পর্কের এই নানা স্তরই হয়তো তাঁদের স্মৃতিকে আজও এতটা জীবন্ত করে রেখেছে।