ভৈরবের তিন সেতুর প্রান্তে ভোর হলেই জমে ওঠে শরীরচর্চার আসর

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৩ AM BST ঢাকা জেলা ২৯ বার পঠিত
ভৈরবের তিন সেতুর প্রান্তে ভোর হলেই জমে ওঠে শরীরচর্চার আসর

collected

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। মেঘনার স্বচ্ছ পানিতে জাল ফেলেছেন কয়েকজন জেলে। পাশাপাশি থাকা দুটি রেলসেতু ও একটি সড়কসেতুর ওপর দিয়ে চলছে ট্রেন ও যানবাহন। নদীতে ছুটছে নৌকা। এরই মধ্যে নদীর পাড়ে জড়ো হতে শুরু করেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ হাঁটছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত শরীরচর্চায়। এক পাশে ছোটদের ফুটবল খেলাও চলছে।

কিশোরগঞ্জের ভৈরব প্রান্তে মেঘনার তিন সেতু ঘিরে প্রতিদিন ভোরে এমন দৃশ্য দেখা যায়। শুধু শুক্রবার নয়, প্রতিদিন কয়েক শ মানুষ এখানে প্রাতর্ভ্রমণে আসেন। কেউ একা, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। আবার কয়েকটি বড় দল নিয়মিত দলবদ্ধভাবে শরীরচর্চা করে।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে অন্তত চারটি বড় দল ‘সূর্যের আগে উঠি’ ধারণাকে সামনে রেখে শরীরচর্চা করছে। এসব দলের আনুষ্ঠানিক কোনো কমিটি নেই, সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকও নেই। তাঁদের মূল কথা—যে দলেই থাকুন, যেখানেই শরীরচর্চা করুন, দিনের শুরুটা হতে হবে সূর্য ওঠার আগে।

হাঁটা থেকে ম্যারাথন

১৪ আগস্ট সকাল পৌনে ছয়টার দিকে নদীর পাড়ে হাঁটছিলেন মফিজুল ইসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর দলের ১৫ জন সদস্য সেখানে জড়ো হন। দলটি ‘ম্যারাথন দৌড় গ্রুপ’ নামে পরিচিত।

সড়কসেতুর নিচে ওয়ার্মআপ শেষে তাঁরা সেতুর ওপর উঠে হালকা দৌড় শুরু করেন। প্রায় এক কিলোমিটার পথ পেরিয়ে পৌঁছে যান আশুগঞ্জ প্রান্তে। দলের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষক, ব্যাংকার, চিকিৎসক ও মসজিদের ইমামও রয়েছেন।

মফিজুল ইসলাম বলেন, আগে রাতে জেগে থাকার কারণে সকালে উঠতে কষ্ট হতো। পরে কয়েকজন মিলে সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে ওঠার সিদ্ধান্ত নেন। এখন সেটিই তাঁদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

দলের সদস্য ব্যাংক ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান জানান, নিয়মিত হাঁটার ফলে তাঁর ওজন ১০ কেজি কমেছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে আলোচনার জন্য তাঁদের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপও রয়েছে। কেউ টানা তিন দিন নদীর পাড়ে না এলে তাঁকে জবাবদিহি করতে হয়।

দলের সদস্যদের কেউ কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে ম্যারাথন দৌড়েও অংশ নেন। ভবিষ্যতে একটি ম্যারাথন ক্লাব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রশিক্ষক মঞ্জু মিয়া।

‘এভারগ্রিন চত্বর’ ঘিরে ইয়োগা ও হাসির চর্চা

দুটি সেতুর মাঝখানে থাকা একটি চত্বরের নাম ‘এভারগ্রিন চত্বর’। এটি ঘিরেও গড়ে উঠেছে বড় একটি প্রাতর্ভ্রমণকারী দল। প্রায় ছয় বছর ধরে সক্রিয় এই দলের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫০।

১৪ আগস্ট সেখানে নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি ইয়োগা করতে দেখা যায় তাঁদের। ঢাকার চিকিৎসক আতাউর রহমান এসে তাঁদের ইয়োগা করান। ব্যায়াম শেষে সবাই মিলে ভুনাখিচুড়ি খাওয়াও তাঁদের শুক্রবারের নিয়মিত আয়োজনের অংশ।

শরীরচর্চার পর দলটির সদস্যরা উচ্চ স্বরে হাসার চর্চা করেন। তাঁদের মতে, এতে শরীর ও মন দুটিই চাঙা থাকে। পরে চলে আড্ডা। সেখানে ভৈরবের পরিবেশ, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, সমাজ, রাষ্ট্র ও বন্ধুত্বসহ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

দলটির প্রশিক্ষক কাজী উসমান গণি বলেন, তাঁদের দলের সদস্যদের সূর্যের আগে ঘুম থেকে উঠে সকাল পৌনে ছয়টার মধ্যে নদীর পাড়ে আসতে হয়। প্রতিদিন প্রায় ৩০ মিনিট ব্যায়াম ও ৩০ মিনিট হাঁটার জন্য তাঁরা সময় দেন।

শরীরচর্চার পাশাপাশি সবুজায়ন

আরেকটি দল নিয়মিত প্রাতর্ভ্রমণের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও কাজ করে। মো. বাবুল, জাকির হোসেন, চিকিৎসক আবুল কাসেম, আলা উদ্দিন ও কাইজার চৌধুরীসহ কয়েকজন এ দলের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন।

হাঁটার পর কেউ কেউ মেঘনার পানিতে গোসল করে বাড়ি ফেরেন। পাশাপাশি নদীর পাড়ের আগাছা পরিষ্কার করা এবং সামাজিক ও নাগরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন তাঁরা।

দলটির উদ্যোগে নদীর পাড়ে বেশ কিছু কৃষ্ণচূড়া ও দুটি বটগাছ লাগানো হয়েছে। বটগাছ দুটি এখন বড় হয়ে ছায়া দিতে শুরু করেছে।

মো. বাবুল বলেন, হাঁটার পাশাপাশি গাছ লাগানো ও নদীর পাড়ের আগাছা পরিষ্কার করাও তাঁদের নিয়মিত কাজ।

দুই দশক ধরে নদীর পাড়ে প্রাতর্ভ্রমণ

মেঘনার পাড়ে প্রাতর্ভ্রমণের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভৈরব সরকারি হাজি আসমত কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামসুজ্জামানের। তাঁর নেতৃত্বে একটি দল প্রায় দুই দশক ধরে নিয়মিত নদীর পাড়ে হাঁটছে।

একসময় তাঁর নেতৃত্বে নদীর পাড়কেন্দ্রিক ‘গাঙ সমিতি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে উঠেছিল। সংগঠনটি এখনো সক্রিয়। বর্তমানে প্রাতর্ভ্রমণকারীদের একটি বড় অংশকে নিয়ে তিনি ‘ট্যুরিস্ট ক্লাব’ও গড়ে তুলেছেন। স্বাস্থ্যসচেতন থাকার পাশাপাশি চারপাশকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করাই এই ক্লাবের অন্যতম উদ্দেশ্য।

শামসুজ্জামান বলেন, প্রাতর্ভ্রমণ করতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, পুরোপুরি সুস্থ থাকতে হলে ভ্রমণও প্রয়োজন। তাই তাঁরা হাঁটার পাশাপাশি দেশ ভ্রমণ করেন।

প্রাতর্ভ্রমণকারীদের ভাষ্য, ভৈরব প্রান্তের তিন সেতু এখন শুধু হাঁটা বা শরীরচর্চার জায়গা নয়। প্রতিদিন ভোরের এই মিলনস্থলে তৈরি হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ, বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্পর্ক। একই সঙ্গে পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধও তৈরি হচ্ছে তাঁদের মধ্যে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: