আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আপসনামা কি আইনি পরিণতি বদলাতে পারে?

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৪ PM BST ৩৩ বার পঠিত
আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় আপসনামা কি আইনি পরিণতি বদলাতে পারে?

collected

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের আত্মহত্যার ঘটনায় করা মামলায় তাঁর পরিবারের সঙ্গে আসামিপক্ষের একটি আপসনামা আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তবে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মতো ফৌজদারি অপরাধ আপসযোগ্য না হওয়ায় শুধু আপসনামা দাখিল করলেই মামলাটি শেষ হয়ে যায় না বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

গত বুধবার আদালতে দাখিল করা ওই আপসনামায় মরিয়মের বাবা ও মামলার বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ উল্লেখ করেছেন, গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম জামিন পেলে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। মামলাটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা হওয়ায় এ আপসনামার আইনি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের বিপরীতে ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম আক্তারের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই ঘটনায় রাতেই গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ। পরে গাজী নজরুল ও মাকসুদাকে পুলিশ হেফাজতে নেয়।

বাংলাদেশের আইনে ফৌজদারি মামলায় আপসের সুযোগ থাকলেও সব অপরাধ আপসযোগ্য নয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে আপসের বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ আঘাত, বেআইনিভাবে বাধা দেওয়া বা আটক রাখা, কিছু ধরনের চুরি, প্রতারণা, মানহানি ও ভয়ভীতি দেখানোর মতো অপরাধ রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাদী নিজে আপস করতে পারেন, আবার কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।

তবে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় বর্ণিত আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় উল্লেখিত আপসযোগ্য অপরাধের তালিকায় নেই। দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। ফলে শুধু বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে সমঝোতা বা লিখিত আপসনামার ভিত্তিতে এ ধরনের মামলা আইনগতভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ নেই বলে আইনজীবীদের মত।

আইনজীবীরা আরও বলছেন, আদালতে আপসনামা দাখিল করা এবং আদালত কর্তৃক আপস গ্রহণ করা—দুটি আলাদা বিষয়। কোনো অপরাধ আইনগতভাবে আপসযোগ্য হলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে দুই পক্ষের সমঝোতা আদালতে উপস্থাপন করা যায়। আদালত সেটি যাচাই করে আইন অনুযায়ী গ্রহণ করলে মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে। কিন্তু আপসযোগ্য নয় এমন অপরাধের ক্ষেত্রে বাদীর সম্মতি বা আপসনামা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য যথেষ্ট নয়।

মরিয়মের বাবা আদালতে দেওয়া আপসনামায় দাবি করেছেন, তাঁর মেয়ে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদার সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে সংসার করছিলেন। শুরুতে ঘটনাটির পর সন্দেহের ভিত্তিতে মামলা করলেও পরে তিনি জানতে পারেন, গাজী নজরুল বা মাকসুদার প্ররোচনায় কিংবা তাঁদের ওপর রাগ-অভিমান করে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি। দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে আপস করা হয়েছে বলেও আপসনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে মামলার পরবর্তী আইনি অবস্থান নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রম। তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবেন এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলার পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। আসামিদের জামিনের বিষয়টিও আদালতের নিজস্ব এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। বাদী কোনো আসামির জামিনে আপত্তি না করলেও আদালত সেটিকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে বাধ্য নন।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী বলেছেন, এ ধরনের মামলায় বাদীর আপসনামা দেওয়ার আইনগত ভিত্তি নেই এবং আসামির জামিন দেওয়ার বিষয়টি আদালতের এখতিয়ার। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরাও বলেছেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আপসযোগ্য নয়।

আইনজীবীদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আপসনামা দাখিলের ফলে মামলাটি নিজে থেকেই বাতিল বা নিষ্পত্তি হবে না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত মামলার আইনি পরিণতি নির্ভর করবে তদন্তের ফল, প্রমাণ এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: