জিন্নাহকে ঘিরে ডাকসু-ছাত্রদলের তৎপরতা: ইতিহাসের কোন পাঠ সামনে আসছে?

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৫২ PM BST ৩২ বার পঠিত
জিন্নাহকে ঘিরে ডাকসু-ছাত্রদলের তৎপরতা: ইতিহাসের কোন পাঠ সামনে আসছে?

collected

হঠাৎ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঘিরে সাদিক কায়েমদের নেতৃত্বাধীন ডাকসুর তৎপরতা কেন শুরু হলো—এ প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে এর প্রতিবাদে ছাত্রদল কেন জিন্নাহকে অস্বীকার বা অপ্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করছে, সেটিও আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো কি না এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের ইতিহাসকে কীভাবে দেখা উচিত—এসব প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় জিন্নাহর ভূমিকা বোঝাতে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির এমিরেটাস অধ্যাপক স্ট্যানলি অ্যালবার্ট উলপার্টের জিন্নাহকে নিয়ে লেখা বইয়ের একটি উদ্ধৃতি প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। সেখানে তিনি জিন্নাহ সম্পর্কে লিখেছেন, ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তনকারী ব্যক্তি খুব কম; বিশ্ব মানচিত্র পরিবর্তনকারী তার চেয়েও কম; আর কোনো জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব পাওয়া মানুষের সংখ্যা আরও কম। জিন্নাহ এই তিনটি কাজই করেছেন—এমন বক্তব্য রয়েছে তার লেখায়।

লেখকের মতে, উলপার্ট জিন্নাহ বা পাকিস্তানের সমর্থক ছিলেন না। তিনি মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর ওপরও গ্রন্থ লিখেছেন।

স্বাধীন বৃহত্তর বাংলার উদ্যোগ

লেখায় দাবি করা হয়েছে, অনেকেই জিন্নাহকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু ভারত ভাগের আগে স্বাধীন ও সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলা প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শরৎচন্দ্র বসু এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, জিন্নাহ এ প্রস্তাবের প্রতি সম্মতি জানিয়েছিলেন। তবে কংগ্রেসের নেতাদের বিরোধিতার কারণে উদ্যোগটি সফল হয়নি।

রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে জিন্নাহর অবস্থান

জিন্নাহর উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার বক্তব্য নিয়েও লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। লেখকের দাবি, জিন্নাহ পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের ভাষা বা ‘লিংগুয়া ফ্রাংকা’ হিসেবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন।

তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাব, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব মাতৃভাষা ছিল যথাক্রমে পাঞ্জাবি, সিন্ধি ও পশতু। লেখকের যুক্তি হলো, উর্দু এসব অঞ্চলের মানুষের মাতৃভাষা না হলেও আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগের ভাষা হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল।

লেখায় আরও দাবি করা হয়েছে, জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে বাংলার বিরোধিতা করেননি। ভাষা প্রশ্নে পরবর্তী সময়ে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়, সেটিকে জিন্নাহর অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখার বিরুদ্ধেও লেখক যুক্তি দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের ভাষা-ভাবনা প্রসঙ্গ

লেখাটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা-ভাবনার প্রসঙ্গও আনা হয়েছে। লেখকের দাবি, রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দির পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

এ প্রসঙ্গে লেখক প্রশ্ন তুলেছেন—অখণ্ড ভারত রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকলে এবং বাংলা ভারতের অংশ হিসেবে থাকলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিন্দির প্রাধান্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কী ছিল। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন, ভাষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের বাস্তবতা এক নয়; বেলজিয়াম বা কানাডার মতো বহুভাষিক রাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সরাসরি তুলনাও সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

ভারত বিভাজনে জিন্নাহর ভূমিকা

ভারত বিভাজনের জন্য জিন্নাহকে এককভাবে দায়ী করার প্রবণতারও সমালোচনা করেছেন লেখক।

তার যুক্তি, ভারত ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘ সময় একটি একক ও অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে পরিচালিত হয়নি। মুঘল আমলেও বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় শাসকেরা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করেছেন। ব্রিটিশ শাসনামলেই প্রথমবারের মতো ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহৎ অংশ একটি কেন্দ্রীয় ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের অধীনে আসে।

লেখায় আরও বলা হয়েছে, জিন্নাহ শুরু থেকেই ভারত বিভক্তির পক্ষে ছিলেন না। সরোজিনী নাইডু তাকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত হিসেবে অভিহিত করেছিলেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। লেখকের মতে, জিন্নাহর রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় সময় কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

১৪ দফা ও কেবিনেট মিশন

জিন্নাহর ১৪ দফা দাবি এবং ১৯৪৬ সালের কেবিনেট মিশন পরিকল্পনাকে ভারত বিভাজনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ দুটি অধ্যায় হিসেবে তুলে ধরেছেন লেখক।

লেখায় বলা হয়েছে, জিন্নাহর ১৪ দফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি ছিল কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলমানদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা। অন্যদিকে কেবিনেট মিশন পরিকল্পনায় ভারতীয় প্রদেশগুলোকে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’—এই তিনটি গ্রুপে ভাগ করে তাদের উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার প্রস্তাব ছিল।

লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, কেবিনেট মিশন পরিকল্পনাটি সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করা হলে একটি শিথিল ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে ভারত অখণ্ড থাকতে পারত। জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ পরিকল্পনাটিকে গ্রহণ করলেও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিশেষ করে জওহরলাল নেহরুর বক্তব্যের কারণে পরিকল্পনাটি নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়।

লেখায় আরও দাবি করা হয়েছে, কংগ্রেসের অবস্থানের কারণে মুসলিম লীগ আশঙ্কা করে যে প্রস্তাবিত কাঠামোর মাধ্যমে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোর কাঙ্ক্ষিত স্বায়ত্তশাসন কার্যকর হবে না। এর ধারাবাহিকতায় ভারত বিভাজনের পথ আরও সুগম হয়।

ইতিহাসবিদ আয়শা জালালের বিশ্লেষণেও জিন্নাহর কিছু দাবিকে দরকষাকষির কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। একইভাবে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিংহ ভারত বিভাজনের জন্য কংগ্রেস ও নেহরুর ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছেন বলে লেখায় দাবি করা হয়েছে।

অখণ্ড ভারত রক্ষার শেষ প্রচেষ্টা

লেখকের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত বিভাজন যখন প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, তখন নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুও জিন্নাহকে অখণ্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার মাধ্যমে বিভাজন ঠেকানোর একটি শেষ প্রচেষ্টা করেছিলেন।

তবে লেখকের মতে, জিন্নাহ ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের বিনিময়ে পাকিস্তানের দাবি ত্যাগ করতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে অটল থাকেন এবং নির্ধারিত দাবির তুলনায় ছোট ভূখণ্ডের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বাস্তবতাও মেনে নেন।

জিন্নাহকে ঘিরে বর্তমান বিতর্ক

লেখাটির শেষাংশে বর্তমান সময়ে জিন্নাহকে ঘিরে ডাকসু, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

লেখকের মতে, জিন্নাহকে নিয়ে ঐতিহাসিক মূল্যায়নে রাজনৈতিক পক্ষপাত না রেখে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়কে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন ডাকসুর সাম্প্রতিক তৎপরতার পেছনে কী রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট কাজ করছে।

লেখায় জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা আবুল আ’লা মওদুদীর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। লেখকের প্রশ্ন, বর্তমান সময়ে জিন্নাহ ও পাকিস্তানকে ঘিরে ছাত্রশিবিরের কিছু অবস্থান কি তাদের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করছে?

অন্যদিকে জিন্নাহ ও পাকিস্তানবিরোধী অবস্থানের জন্য ছাত্রদলের সমালোচনাও করেছেন লেখক। বিএনপির কিছু নেতার জিন্নাহবিরোধী বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি মনে করেন, এ ধরনের অবস্থান দলটির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে।

সবশেষে লেখক বলেছেন, জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে ইতিহাসকে রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী একপাক্ষিকভাবে ব্যাখ্যা না করে সংশ্লিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা, সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

লেখক: বর্তমানে সুইডেনপ্রবাসী একজন সিনিয়র বাংলাদেশি সাংবাদিক।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: