collected
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে এলেও রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল সাতটার দিকে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। অনেক স্বজনকে অগ্নিকাণ্ডের স্থান ঘুরে দেখতেও দেখা যায়।
হাসপাতালের পঞ্চম তলার নেফ্রোলজি বিভাগে চিকিৎসাধীন তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জের আবদুল করিম জানান, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে হইচই শুরু হয়। তিনি তখন মেঝেতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর সামনেই থাকা একটি সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে গিয়ে কয়েকজন তালাবদ্ধ দরজা দেখতে পান। পরে তালা ভেঙে বের হওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ওই সময় বের হতে না পারলে কী ঘটত—এমন আতঙ্ক এখনো তাঁর মনে রয়েছে।
হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের স্বজনদের একজন হাদিসা খাতুন বলেন, হঠাৎ চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা নিচে নামতে পারেননি। পরে সবাইকে ভবনের একটি অংশে সরিয়ে রাখা হয়। তাঁর দাবি, ধোঁয়ার কারণে কয়েকজন বমি করেন এবং অসুস্থ বোধ করেন। শিশুদের নিয়ে তাঁরা একটি কক্ষের এক কোণে অবস্থান করেন। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর তাঁদের আবার ওয়ার্ডে নেওয়া হয় এবং চিকিৎসকেরা রোগীদের দেখেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। এতে লিফটের বাইরের অংশ পুড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আগুন লাগার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনদের অনেকে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে আহত হন। এ ঘটনায় চারজনের মৃত্যুর তথ্য ছড়িয়ে পড়লেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্য নাকচ করেছে।
হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম জানান, আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনেরা নিচে নেমে যান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে মাইকিং করে তাঁদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে ফিরে যেতে বলা হয়।
রেজিস্টারের তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা
অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের একটি রেজিস্টারের পাতার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান রেজিস্টারের পাতাটি হাসপাতালের বলে নিশ্চিত করেছেন।
ওই রেজিস্টারে পাঁচজনের তথ্য রয়েছে। তাঁদের মধ্যে ফুলবাড়িয়ার জাহানারা বেগম (৫০) ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। অন্য চারজনের নামের পাশে ‘ব্রট ডেড’ লেখা রয়েছে।
রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, তারাকান্দার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার (৩৫), ফুলবাড়িয়ার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫), পূর্বধলার ভূগী জাওয়ানী গ্রামের হাজেরা বেগম (৫০) এবং ফুলবাড়িয়ার বিদ্যানন্দ গ্রামের রমজান আলী (৩৮) মারা গেছেন।
স্বজনদের দাবি, তাঁদের কেউ কেউ পদদলিত হয়ে মারা গেছেন। তবে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, পদদলিত হয়ে মারা গেলে শরীরে যে ধরনের চিহ্ন বা উপসর্গ থাকার কথা, চিকিৎসকেরা ওই চারজনের শরীরে তেমন কোনো চিহ্ন পাননি। তাঁদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের আওতায় থাকবে।
রেজিস্টারে ওই চারজনের মৃত্যুর ধরন হিসেবে ‘ফায়ার এক্সিডেন্ট’ লেখা প্রসঙ্গে মাইনউদ্দিন খান বলেন, ঘটনার পর হাসপাতালে আসা ব্যক্তিদের হিসাব রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট নার্স রেজিস্টারে এভাবে তথ্য লিখেছেন। এর অর্থ তাঁরা আগুনে মারা গেছেন—এমন নয়।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও ঘটনার সঙ্গে কারও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে কমিটির প্রধান ও সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।
মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, লিফটে আগুন লাগার ঘটনায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি তা খতিয়ে দেখবে। কারও গাফিলতি পাওয়া গেলে তা চিহ্নিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।