ছবি: সংগৃহীত
উড়তে বলা হয়, কিন্তু অনেক সময় সেই উড়ানের জন্য প্রয়োজনীয় আকাশের ঠিকানাটাই দেওয়া হয় না। নারীকে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও সামাজিক, পারিবারিক ও পুরুষতান্ত্রিক নানা সীমারেখা তার পথকে সংকুচিত করে রাখে। এর পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারীরা শিকার হন ধর্ষণ, যৌন সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন ও সামাজিক নিপীড়নের।
নারীর ওপর সহিংসতার এই বাস্তবতা শুধু সংবাদ বা গবেষণার বিষয় নয়, চলচ্চিত্রেও বারবার উঠে এসেছে। সিনেমা বিনোদনের পাশাপাশি সমাজের নানা সংকট, বৈষম্য, নিপীড়ন ও প্রতিরোধের গল্প তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্মাতারা নারীর জীবনের কঠিন বাস্তবতা নিয়ে নির্মাণ করেছেন সিনেমা ও প্রামাণ্যচিত্র।
কলিং দ্য ঘোস্ট: আ স্টোরি অ্যাবাউট রেপ, ওয়ার অ্যান্ড উইমেন (১৯৯৭)
বসনিয়া যুদ্ধের সময় নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতার ভয়াবহতা নিয়ে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র। যুদ্ধের মধ্যে বন্দি ও নির্যাতিত নারীদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছিল। নির্যাতনের পর বেঁচে থাকা, সেই স্মৃতি বহন করা এবং ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করার বিষয়টি চলচ্চিত্রটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দ্য গ্রেটেস্ট সাইলেন্স: রেপ ইন দ্য কঙ্গো (২০০৭)
কঙ্গোর দীর্ঘ সংঘাতের পটভূমিতে নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার বাস্তবতা তুলে ধরে এই প্রামাণ্যচিত্র। যুদ্ধের সময় ধর্ষণ কীভাবে ব্যক্তিগত অপরাধের পাশাপাশি একটি জনগোষ্ঠীকে দুর্বল করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, সেটিও এতে সামনে আসে। নির্যাতনের পর সামাজিক কলঙ্ক, একাকিত্ব ও বিচারহীনতার সঙ্গে নারীদের লড়াইয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
লাভ ক্রাইমস অব কাবুল (২০১১)
আফগানিস্তানের সামাজিক ও বিচারব্যবস্থার বাস্তবতায় নারীদের জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র। প্রেম, সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মতো বিষয় কীভাবে একজন নারীর জন্য অপরাধের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সরাসরি সহিংসতার পাশাপাশি সামাজিক নিয়ন্ত্রণের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে।
নো বুরকাস বিহাইন্ড বারস (২০১২)
আফগানিস্তানের একটি নারী কারাগারে বন্দি নারীদের জীবন ও অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র। বন্দি নারীদের পারিবারিক জীবন, সামাজিক অবস্থান, অপরাধের অভিযোগ এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপের নানা দিক এতে উঠে এসেছে। একজন নারীর জীবনে পারিবারিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কীভাবে তার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
দ্য ওয়ার অ্যাগেইনস্ট উইমেন (২০১৩)
যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে নারীদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতাকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই প্রামাণ্যচিত্র। বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের নারীদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে, কীভাবে যুদ্ধের সময় নারীর শরীরকে সহিংসতার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে যৌন সহিংসতার বিষয়টি দেখার সুযোগ তৈরি করে চলচ্চিত্রটি।
দ্য কালার পার্পল (১৯৮৫)
অ্যালিস ওয়াকারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্রে আফ্রিকান-আমেরিকান নারী সিলির দীর্ঘ নির্যাতন ও আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার গল্প বলা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন, বর্ণবৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের মধ্যেও সিলির নিজের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়ার যাত্রা চলচ্চিত্রটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখানে নির্যাতিত নারীকে শুধু অসহায় হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধ ও আত্মমর্যাদার অধিকারী হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।
নট উইদাউট মাই ডটার (১৯৯১)
একজন মার্কিন নারীর ইরানে স্বামী ও পরিবারের সঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা এবং মেয়েকে নিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্র। সাংস্কৃতিক পার্থক্য, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে একজন মায়ের লড়াই এখানে মূল বিষয়। তবে ইরান ও ইসলামি সমাজের উপস্থাপনাকে ঘিরে চলচ্চিত্রটি বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে।
অজেয়া (২০২৬)
সাম্প্রতিক সময়ের এই চলচ্চিত্রেও নারীর লড়াই, প্রতিকূলতা ও নিজের অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নারীকে কেবল নির্যাতনের শিকার হিসেবে দেখানোর পরিবর্তে তার প্রতিরোধ, আত্মবিশ্বাস ও ঘুরে দাঁড়ানোর দিকটি সামনে আনার চেষ্টা রয়েছে এতে।
সিনেমাগুলোর গল্প, সময় ও প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও একটি বিষয় তাদের মধ্যে মিল তৈরি করে—নারীর শরীর, স্বাধীনতা ও নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারের ওপর নিয়ন্ত্রণ। কোথাও যুদ্ধ নারীর শরীরকে সহিংসতার লক্ষ্য বানিয়েছে, কোথাও পরিবারই হয়ে উঠেছে নির্যাতনের জায়গা, আবার কোথাও সামাজিক কাঠামো একজন নারীর নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার সীমিত করেছে।
তবে এসব গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতিরোধ। অনেক চলচ্চিত্রেই নির্যাতনের পাশাপাশি উঠে এসেছে নারীর ঘুরে দাঁড়ানো, নিজের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া এবং স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের গল্প।
নারীকে শুধু এগিয়ে যাওয়ার কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তার জন্য প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ, স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ এবং সহিংসতা ও বৈষম্য থেকে মুক্ত থাকার অধিকার। অর্থাৎ, একজন নারীকে উড়তে বলার পাশাপাশি তার জন্য নিরাপদ ও স্বাধীন আকাশও তৈরি করতে হয়।