নারীর প্রতি অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে ‘নো মোর সাইলেন্স’, প্রকাশ করছে মন্তব্যকারীদের পরিচয়

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৮ AM BST ২৪ বার পঠিত
নারীর প্রতি অনলাইন হয়রানি ঠেকাতে ‘নো মোর সাইলেন্স’, প্রকাশ করছে মন্তব্যকারীদের পরিচয়

collected

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের প্রতি অশালীন মন্তব্য, বিদ্রূপ ও যৌন হয়রানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে ‘নো মোর সাইলেন্স’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ। বিভিন্ন সংবাদ ও আলোচিত ঘটনার নিচে নারীদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা ব্যক্তিদের ছবি, পরিচয় ও ফেসবুক আইডির লিংক প্রকাশ করছে গ্রুপটি। গ্রুপটির দাবি, এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগে সামাজিক জবাবদিহির পাশাপাশি ভুল পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

সম্প্রতি কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নারী নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার জন্ম দেয়। কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ তাকে নিয়ে অশালীন মন্তব্য ও বিদ্রূপ করেন। এসব মন্তব্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সেগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় প্রকাশ করে ‘নো মোর সাইলেন্স’।

গত বছরের ২ নভেম্বর যাত্রা শুরু করা গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা বর্তমানে ৩০ হাজারের বেশি। প্রতিষ্ঠাতা আবির আহম্মেদ পিয়াস একজন লেখক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবমাননাকর, অপমানজনক ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের মাধ্যমে মানুষের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার বিষয়গুলো জনসমক্ষে তুলে ধরাই গ্রুপটির উদ্দেশ্য। তাঁর মতে, অনলাইনে করা মন্তব্যও সামাজিক আচরণের অংশ। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পাশাপাশি অন্যের মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রতিও দায়িত্বশীল থাকা জরুরি।

গ্রুপটি গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে হবিগঞ্জের একটি কনসার্টে নারীদের যৌন হয়রানির ঘটনা। বৃন্দাবন সরকারি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের রজতজয়ন্তী উপলক্ষে জালাল স্টেডিয়ামে আয়োজিত ওই কনসার্টে নারীদের হেনস্তার খবর প্রকাশিত হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করার ঘটনা নিয়ে কদর্য ভাষায় মন্তব্য করা হয়। মন্তব্যটির নিচে হাসির প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। ঘটনাটি দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে আবির আহম্মেদ পিয়াস ও তাঁর দুই সহযোগী অনলাইনে এমন আচরণের জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গ্রুপটি গড়ে তোলেন।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় নারীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে গ্রুপটি। কক্সবাজারের একটি হোটেলের শৌচাগারে এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের খবরের নিচে মন্তব্য করা ছয় ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয়। সাভারে বাসের ভেতরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগসংক্রান্ত সংবাদে ধর্ষণের পক্ষে মন্তব্য করা পাঁচ ব্যক্তির পরিচয়ও প্রকাশ করে গ্রুপটি। এ ছাড়া রাজধানীর ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর শারমিন রিয়ার সঙ্গে এক মোটরসাইকেলচালকের বাদানুবাদের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁকে লক্ষ্য করে করা গালিগালাজ ও অশ্লীল মন্তব্যের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয় গ্রুপটি।

শারমিন রিয়া প্রথম আলোকে বলেন, পর্দার আড়ালে থেকে মন্তব্য করার সুযোগ পেয়ে অনেকে নিজের কথার দায়বদ্ধতা ভুলে যান। তাঁর মতে, কোনো প্রতিবাদের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি চান, প্রতিবাদকারীকে হেয় করার পরিবর্তে যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা হচ্ছে, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হোক।

গ্রুপটির দাবি, বিভিন্ন ক্ষেত্রে মন্তব্যের স্ক্রিনশট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে সতর্ক করার ঘটনাও ঘটেছে। একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক ব্যক্তির মন্তব্যের স্ক্রিনশট পাঠানোর পর অভ্যন্তরীণ তদন্ত হয় বলে গ্রুপটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ফরিদপুরের এক তরুণের বিরুদ্ধে নিজের বোনের সঙ্গে অরুচিকর আচরণ করে ভিডিও তৈরির অভিযোগসংক্রান্ত পোস্ট দেওয়ার পর পুলিশ তাঁকে আটক করে বলে দাবি করেছে গ্রুপটি।

তবে পরিচয় প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুলের ঝুঁকিও সামনে এসেছে। কুমিল্লার কিশোরীর মায়ের বক্তব্যসংক্রান্ত একটি সংবাদে অশালীন মন্তব্য করা এক ব্যক্তি নিজেকে রাজধানীর সানরাইজ প্লাজার বিশ্বরঙ শোরুমের বিক্রয়কর্মী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর পরিচয় প্রকাশের পর বিশ্বরঙ এক বিবৃতিতে জানায়, ওই নামে তাদের কোনো কর্মী নেই। এ ঘটনা দেখায়, কোনো অ্যাকাউন্টের পরিচয় যাচাই না করে তা প্রকাশ করলে নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হতে পারেন। ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা হ্যাক হওয়া আইডি থেকেও অন্য কেউ মন্তব্য করতে পারেন।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন প্ল্যাটফর্মের ফোকাল পারসন মনীষা বিশ্বাস বলেন, অশালীন মন্তব্য ও ছবি বিকৃত করার ঘটনায় নারীরা অনেক সময় আইনি প্রতিকার নেন না। এতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা উৎসাহিত হতে পারেন। তাঁর মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা বাড়ানো এবং আইনে কী শাস্তির বিধান রয়েছে, সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে কারও পরিচয় প্রকাশের আগে যথাযথভাবে তথ্য যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: