নিখিলেশ থেকে আজিজ, ভিক্টর ব্যানার্জির অভিনয়ের বিস্তৃত পৃথিবী

Pinky Saha Pinky Saha ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৪ AM BST ৪৪ বার পঠিত
নিখিলেশ থেকে আজিজ, ভিক্টর ব্যানার্জির অভিনয়ের বিস্তৃত পৃথিবী

ছবি: সংগৃহীত

নিখিলেশ আর আজিজ—দুই চরিত্র, দুই পৃথিবী। একজন শান্ত, সংযত ও যুক্তিবাদী; অন্যজন আবেগপ্রবণ, বন্ধুত্বে উদার। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে-বাইরে’র নিখিলেশ এবং ডেভিড লিনের ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’র ডা. আজিজ—এই দুই চরিত্রে অভিনয় করে ভিক্টর ব্যানার্জি দেখিয়েছেন তাঁর অভিনয়ের বিস্তৃত পরিসর।

১৫ অক্টোবর ভিক্টর ব্যানার্জির ৮০তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪৬ সালে কলকাতায় জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি ও অসমিয়া চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সিনেমাতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, শ্যাম বেনেগাল, জেমস আইভরি, ডেভিড লিন, রোমান পোলানস্কি ও ক্লের ডেনির মতো খ্যাতিমান নির্মাতাদের ছবিতে কাজ করেছেন তিনি।

সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক ভিক্টর ব্যানার্জির। পরে ‘ঘরে-বাইরে’ ছবিতে নিখিলেশ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা পায়। এই চরিত্রের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার সম্মান পান তিনি।

অন্যদিকে ই এম ফরস্টারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়া’য় ডা. আজিজ চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিতি পান ভিক্টর। ডেভিড লিনের এই ছবিতে ভারতীয় চিকিৎসকের চরিত্রে তাঁর আবেগ, আন্তরিকতা ও আহত আত্মমর্যাদার প্রকাশ তাঁকে আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। এই অভিনয়ের জন্য ১৯৮৬ সালে বাফটা পুরস্কারে সেরা প্রধান অভিনেতা বিভাগে মনোনয়ন পান তিনি।

ভিক্টর ব্যানার্জির অভিনয়জীবন শুধু সত্যজিৎ রায় ও ডেভিড লিনের ছবিতে সীমাবদ্ধ নয়। রোমান পোলানস্কির ‘বিটার মুন’, রোনাল্ড নিমের ‘ফরেন বডি’ এবং ফরাসি নির্মাতা ক্লের ডেনির ‘হাই লাইফ’-এর মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। ‘হাই লাইফ’-এ মহাকাশযাত্রার গল্পে একজন ভারতীয় অধ্যাপকের চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরিত্রেও পর্দায় হাজির হয়েছেন ভিক্টর ব্যানার্জি। আর্জেন্টিনার নির্মাতা পাবলো সেজারের ‘থিঙ্কিং অব হিম’ ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও আর্জেন্টাইন লেখক ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ককে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবিতে তাঁর অভিনয় ছিল ক্যারিয়ারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সঙ্গেও রয়েছে ভিক্টর ব্যানার্জির যোগসূত্র। রুবাইয়াত হোসেনের ‘মেহেরজান’ ছবিতে নানাজান চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। চরিত্রটির প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশের সংস্কৃতি, লালন ও বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়েও কাজ করেছিলেন এই অভিনেতা।

বাংলা ও হিন্দি মূলধারার চলচ্চিত্রেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন ভিক্টর। ‘দুই পৃথিবী’, ‘একান্ত আপন’, ‘লাঠি’, ‘ভূত’, ‘সরকার রাজ’, ‘তা রা রাম পাম’ ও ‘আপনে’র মতো বিভিন্ন ঘরানার ছবিতে দেখা গেছে তাঁকে। সাম্প্রতিক সময়েও ‘রক্তবীজ’ ও ‘রক্তবীজ ২’-এর মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করলেও নিজের অভিনীত ছবি দেখার প্রতি ভিক্টর ব্যানার্জির আগ্রহ খুব বেশি নয়। সাক্ষাৎকারও দেন বেছে বেছে। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করেন তিনি। পাহাড়ের নিরিবিলি পরিবেশ, বই, সাহিত্য ও দর্শনচর্চায় সময় কাটাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ এই অভিনেতা।

অভিনয়ের পাশাপাশি তথ্যচিত্রের কাজেও জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন ভিক্টর ব্যানার্জি। ২০২২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মভূষণে সম্মানিত করে। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রাজনীতিতেও একসময় যুক্ত ছিলেন তিনি।

নিখিলেশের নীরবতা, আজিজের আবেগ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব—প্রতিটি চরিত্রেই নিজেকে ভিন্নভাবে মেলে ধরেছেন ভিক্টর ব্যানার্জি। তাই তাঁর ৮০তম জন্মদিন শুধু একজন অভিনেতার জন্মদিন নয়, বরং বাংলা ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে কয়েক দশকের এক বৈচিত্র্যময় অভিনয়যাত্রাকে ফিরে দেখারও উপলক্ষ।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: