নোয়াখালীতে ৭ মাসে পানিতে ডুবে ৭২ শিশুর মৃত্যু

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১:০৪ PM BST চট্টগ্রাম ২৮ বার পঠিত
নোয়াখালীতে ৭ মাসে পানিতে ডুবে ৭২ শিশুর মৃত্যু

collected

দুই মেয়ের পর সংসারে জন্ম নিয়েছিল ছেলে। তাই নোয়াখালী জেলা আদালতের আইনজীবী আবদুর রহিমের পরিবারে আনন্দের কমতি ছিল না। কিন্তু আড়াই বছর বয়সেই পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে সেই সন্তান।

গত শুক্রবার নোয়াখালী সদর উপজেলার নেয়াজপুর ইউনিয়নের দেবীপুর গ্রামের বাড়ির পুকুরে ডুবে মারা যায় আবদুর রহিমের ছেলে ইলহাম নূর ফালাক।

আবদুর রহিম জানান, ঘটনার সময় তাঁর স্ত্রী রান্নার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আর তিনি ছিলেন জুমার নামাজে। মাত্র ১০ থেকে ১৫ মিনিট শিশুটি মায়ের নজরের বাইরে ছিল। এর মধ্যেই সে বাড়ির পুকুরঘাটের দিকে চলে যায়।

পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে খুঁজতে গিয়ে পুকুরঘাটে তার জুতা দেখতে পান। পরে পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে অচেতন অবস্থায় ইলহামকে উদ্ধার করা হয়। দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ইলহামের মতো নোয়াখালীতে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয় উপজেলায় এ সময়ে পানিতে ডোবার ১৯৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় মারা গেছে ৭২ শিশু।

তবে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে এ সময়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

হাতিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি

উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি উপকূলীয় উপজেলা হাতিয়ায়। সেখানে ৫৬টি পানিতে ডোবার ঘটনায় ৪৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এ ছাড়া কোম্পানীগঞ্জে ৩৮টি ঘটনায় ১৪ শিশু, কবিরহাটে ২৩টি ঘটনায় ১১ শিশু এবং সেনবাগে ৩৭টি ঘটনায় চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

অন্যদিকে চাটখিলে ৩১টি, বেগমগঞ্জে ১৮টি, সুবর্ণচরে আটটি এবং সোনাইমুড়ীতে একটি পানিতে ডোবার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। এসব ঘটনায় কোনো প্রাণহানির তথ্য পাওয়া যায়নি।

সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন নিরাপদ পরিবেশ

জেলা সিভিল সার্জন মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়। তবে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার দায়িত্ব নয়। যুব উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, বাবা কর্মক্ষেত্রে গেলে অনেক মা সংসারের বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। এ সময় শিশুরা একা হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে পানিতে পড়ে যেতে পারে। তাই শিশুদের ডে-কেয়ার সেন্টার বা নির্ভরযোগ্য কারও তত্ত্বাবধানে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা কমানো সম্ভব।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শাহনাজ আক্তার বলেন, নদী ও জলাশয়বেষ্টিত নোয়াখালী অঞ্চলে অনেক বাড়ির সামনেই উন্মুক্ত পুকুর রয়েছে। এ কারণে শিশুদের পানিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।

তিনি বলেন, এই ‘নীরব মহামারি’ প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি শিশুদের অল্প বয়স থেকেই সাঁতার শেখানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের সার্বক্ষণিক নজরদারি, বাড়ির আশপাশের পুকুর ও জলাশয় নিরাপদ করা, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া এবং শিশুদের সাঁতার ও পানিতে নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: