সংসদীয় কমিটিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি, বদলায়নি রাজনৈতিক বাস্তবতা

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৫০ AM BST ৩১ বার পঠিত
সংসদীয় কমিটিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি, বদলায়নি রাজনৈতিক বাস্তবতা

collected

বিরোধী দলে থাকার সময় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলেছিল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। তবে ক্ষমতায় যাওয়ার পর কোনো দলই সেই দাবি বাস্তবায়নে স্থায়ী উদ্যোগ নেয়নি। ফলে প্রায় তিন দশক পরও সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব অনেকাংশে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টনকে কেন্দ্র করে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হয়। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুসারে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতির পদ পেয়েছে তারা।

চলতি সংসদে মোট ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি বিষয়ভিত্তিক এবং ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি। সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে।

বিরোধী দলের দাবি ছিল, জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী ১০টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ তাদের দেওয়া হোক। অন্যদিকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অতীতের রীতি অনুসারেই এবার কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন হলে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে। তবে সব কমিটিতেই বিরোধী দলের একাধিক সদস্য রাখা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলো ১০ সদস্যের। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী এসব কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। মন্ত্রী নন—এমন সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সভাপতি নির্বাচিত হন। কয়েকটি বিষয়ভিত্তিক কমিটির সভাপতির পদ আবার পদাধিকারবলে নির্ধারিত।

তবে অন্য কমিটিগুলোর সভাপতি কোন দল থেকে হবেন কিংবা সদস্যদের মধ্যে কোন দলের কতজন থাকবেন, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া নেই। সংসদে কণ্ঠভোটে কমিটি গঠিত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দলের সিদ্ধান্তই মূলত প্রাধান্য পায়।

সপ্তম সংসদে বিএনপির দাবি

১৯৯৬ সালে গঠিত সপ্তম সংসদে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে মন্ত্রীদের সুযোগ বন্ধ করে দেয় তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এর আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরাই এসব কমিটির সভাপতি হতেন।

কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধনের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে বিএনপির তিনজন সদস্য ছিলেন। তখন বিএনপির দাবি ছিল সংসদীয় কমিটি ১২ সদস্যের করা এবং সংসদে দলগুলোর আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটিতে সদস্য রাখার বিধান করা।

১৯৯৭ সালের ১৪ মে বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও বিএনপির ওই দুটি দাবি প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। একই বছরের ১০ জুন সংসদে প্রতিবেদনটি পাস হলে প্রতিবাদে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ওয়াকআউট করে।

পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কমিটি গঠন শুরু হলে বিএনপি প্রথম দিকে সদস্যদের নাম দেয়নি। ১৯৯৮ সালের মার্চে দুই দলের মধ্যে বৈঠকের পর সমঝোতা হলে সংসদে ফেরার ঘোষণা দেয় দলটি। ওই বছরের ১২ মে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয় এবং বিএনপিকে মোট ১১১টি সদস্যপদ দেওয়া হয়। তবে কোনো কমিটির সভাপতি পদ পায়নি দলটি।

অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগের দাবি

২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে যায়। তখন সংসদীয় কমিটি নিয়ে দুই দলের মধ্যে আবারও মতবিরোধ দেখা দেয়।

এবার আওয়ামী লীগ আসনসংখ্যার অনুপাতে ১০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দাবি করে। ক্ষমতাসীন বিএনপি অবশ্য এর বিরোধিতা করে আগের সংসদের উদাহরণ তুলে ধরে। তাদের যুক্তি ছিল, আগের সংসদে বিএনপির ১১৬ জন সদস্য থাকলেও আওয়ামী লীগ তাদের কোনো কমিটির সভাপতি পদ দেয়নি।

অষ্টম সংসদে কমিটি গঠনের সময় আওয়ামী লীগের জন্য কিছু সদস্যপদ খালি রাখা হলেও দলটি দীর্ঘদিন সংসদীয় কমিটির কার্যক্রম বর্জন করে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়। তবে ওই সংসদেও বিরোধী দল কোনো সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ পায়নি।

পরবর্তী সংসদগুলোতে কিছুটা পরিবর্তন

পরবর্তী সংসদগুলোতে বিরোধী দলকে একাধিক সংসদীয় কমিটির সভাপতি করার নজির তৈরি হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০১৮ সালের ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নবম সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি থেকে দুটি এবং অন্য একটি বিরোধী দল থেকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল।

দশম সংসদে বিরোধী দল থেকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়। একাদশ সংসদে সরকারি হিসাব কমিটির পাশাপাশি আরও তিনটি কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। এগুলো ছিল প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

তবে এসব নজির থাকলেও বিরোধী দলের জন্য আনুপাতিক হারে সদস্য ও সভাপতি পদ নিশ্চিত করার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি।

অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদের মতে, বিরোধী দল থেকে আনুপাতিক হারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা উচিত। তাঁর বক্তব্য, বিএনপি এবার আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দিলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিনিধিত্বের পথ আরও সুগম হতে পারত। একই সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিদ্যমান দূরত্বও কিছুটা কমতে পারত।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: