ব্রেকিং

সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে টানাপোড়েন স্পষ্ট তৃতীয় সংসদ অধিবেশনে

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৬ AM BST ৩৯ বার পঠিত
সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে টানাপোড়েন স্পষ্ট তৃতীয় সংসদ অধিবেশনে

collected

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিভিন্ন সংস্কারের ভিত্তি তৈরি ও প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের প্রত্যাশা থাকলেও, অধিবেশনের কার্যক্রমে এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে।

২৭ আগস্ট শুরু হয়ে ১০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া তৃতীয় অধিবেশন চলে মোট ৯ কার্যদিবস। এ সময়ে ছয়টি বিল পাস হয়েছে। বিভিন্ন বিধিতে সংসদ সদস্যরা ১৫০টির বেশি নোটিশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ১৫টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের জন্য দেওয়া ২ হাজার ৬৭৬টি প্রশ্নের মধ্যে ১ হাজার ৬৭৮টির উত্তর দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ৩৫টি এই অধিবেশনে গঠিত হয়েছে। বাকিগুলো এর আগে গঠিত হয়েছিল।

সংস্কারসংশ্লিষ্ট আইন নিয়ে বিতর্ক

এই অধিবেশনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত দুটি বিল পাস হয়েছে। বিরোধী দলের অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ-সংক্রান্ত যে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল, নতুন বিলগুলো তার তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল করা হয়েছে। এসব বিল পাসের প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নেয়নি বলে জানানো হয়েছে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব শৃঙ্খলা বাহিনীকে দেওয়ার বিধান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী সেই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না—এমন বিধান রাখা হয়েছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইনে কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এবং শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। নতুন আইনে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

র‌্যাব বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের বিল নিয়েও বিরোধী দলের আপত্তি ছিল। তাদের অভিযোগ, নাম পরিবর্তন হলেও র‌্যাবের জনবল, সম্পদ, ক্ষমতা ও কাঠামো নতুন বাহিনীতে চলে যাচ্ছে।

জুলাই সনদ অনুযায়ী কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ

তৃতীয় অধিবেশনের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বিরোধ ছিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদে আসনের অনুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচনের প্রস্তাব রয়েছে।

বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী, সংসদে তাদের আসন প্রায় ২৬ শতাংশ হওয়ায় জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুসারে ৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির মধ্যে ১০টিসহ মোট ১৪টি সভাপতি পদ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তারা পেয়েছে একটি পদ।

আইন প্রণয়নে তাড়াহুড়ার অভিযোগ

চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে ৯১টি বিল পাস হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশ অনুমোদনের সময়সীমার কারণে তখন দ্রুত আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা ছিল। তবে তৃতীয় অধিবেশনেও বিল পাসে একই ধরনের তাড়াহুড়ার অভিযোগ উঠেছে।

৯ কার্যদিবসের অধিবেশনে ছয়টি বিল পাস করা হয়। সময়স্বল্পতাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। এসআরবি বিল ছাড়া অন্য বিলগুলো পরীক্ষা করতে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে দুই দিন করে সময় দেওয়া হয়। বিরোধী দলের দাবির পর এসআরবি বিলের ক্ষেত্রে চার দিন সময় দেওয়া হলেও কমিটিগুলো প্রতিটি বিল নিয়ে একটি করে বৈঠক করেছে।

কোনো কোনো বিল বিধি অনুযায়ী সংসদে উত্থাপনের তিন দিন আগে সদস্যরা পাননি বলেও অভিযোগ ওঠে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এ বিষয়ে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনা করে বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর যত দ্রুত সম্ভব বিল সংসদে পাঠানো প্রয়োজন, যাতে সদস্যরা তা ভালোভাবে পড়ে আসতে পারেন।

ভিন্নমত প্রকাশের পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন

অধিবেশনের প্রথম দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই করেন। পরে বক্তব্য প্রত্যাহারের ঘোষণা এলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। একপর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

অধিবেশনের শেষ দিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্য ঘিরেও সরকারি দলের সদস্যদের প্রতিবাদ ও হট্টগোল হয়। এ সময় অশালীন ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যে বাধা দেওয়া গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে।

জনস্বার্থের বিষয়েও আলোচনা

তবে তৃতীয় অধিবেশন শুধু রাজনৈতিক বিরোধেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং সারসংকটের মতো জনস্বার্থের বিষয়েও সংসদে আলোচনা হয়েছে।

জ্বালানি সংকটের জন্য সরকার অতীতের ভুল নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে সমাধানের পরিকল্পনা তুলে ধরেছে। সারসংকট নিয়ে সরকার পর্যাপ্ত মজুতের কথা জানালেও বিরোধী দল কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিতরণব্যবস্থার ব্যর্থতার অভিযোগ করেছে।

সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইনের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের অধ্যাদেশের তুলনায় নতুন আইনগুলো কিছু ক্ষেত্রে পেছনের দিকে গেছে। তার মতে, সংস্কার প্রশ্নে এখন পর্যন্ত সরকারের কার্যক্রম হতাশাজনক।

সব মিলিয়ে তৃতীয় অধিবেশনে আইন পাস, সংসদীয় কমিটি গঠন এবং জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও সংস্কারসংশ্লিষ্ট আইন, কমিটির নেতৃত্ব এবং ভিন্নমত প্রকাশের পরিবেশ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের দূরত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: