নেপাল-চীন সীমান্তে বন্যা, নিখোঁজ স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় পরিবার

Pinky Saha Pinky Saha ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০১ PM BST ২৮ বার পঠিত
নেপাল-চীন সীমান্তে বন্যা, নিখোঁজ স্বজনের ফেরার অপেক্ষায় পরিবার

ছবি: সংগৃহীত

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের পর নেপাল-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থলবন্দরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির স্রোতে যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এখনো নিখোঁজ স্বজনদের ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন বহু পরিবার।

নয়াদিল্লির বাসিন্দা অজয় গুপ্ত ও তাঁর স্ত্রী প্রতিদিন নিখোঁজ মেয়ে অরুশি গুপ্তের ফোনের অপেক্ষায় থাকছেন। ৩৩ বছর বয়সী অরুশি কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে নেপাল হয়ে চীনের তিব্বত অঞ্চলে যাচ্ছিলেন। গত ২৬ আগস্ট বন্যার দিন নেপালের গিরং বন্দর থেকে বাবাকে শেষবারের মতো হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান তিনি।

শেষ বার্তায় অরুশি গিরং বন্দরের ইমিগ্রেশন পোস্টের একটি ছবিও পাঠিয়েছিলেন। এর আগে যাত্রাপথের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন তিনি। নেপালের একটি হোটেলে দুধ চা পান করা, ওষুধ খাওয়া কিংবা এক সহযাত্রীর পাসপোর্ট সঙ্গে না থাকায় শেষ মুহূর্তে তৈরি হওয়া জটিলতার কথাও জানিয়েছিলেন। বন্যার দিন সকালে তিনি বাবাকে জানিয়েছিলেন, সীমান্তে যেতে আরও প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটতে হবে।

অরুশির বাবা ৬৩ বছর বয়সী অজয় গুপ্ত এখনো বিশ্বাস করেন, তাঁর মেয়ে সীমান্ত পেরিয়ে তিব্বতের দিকে যেতে পেরেছেন এবং কোনো নিরাপদ উঁচু জায়গায় অবস্থান করছেন। মেয়ের স্বামী ও স্ত্রীও একই আশা ধরে রেখেছেন।

হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় নেপালের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ কাদা ও পাথরের স্রোতে জনপদ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কর্মকর্তাদের হিসাবে, নেপাল অংশে এখনো হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের অংশেও বহু মানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন, যাদের মধ্যে বিদেশি নাগরিকও রয়েছেন।

তবে এই বিপর্যয়ের মধ্যেও কিছু মানুষকে উদ্ধারের ঘটনা স্বজনদের আশাবাদী করে রেখেছে। নেপালের একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেল থেকে কয়েকজনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে। যদিও সময় গড়ানোর সঙ্গে উদ্ধার অভিযান নিয়ে নিয়মিত তথ্য পাওয়ার পরিমাণ কমে আসায় নিখোঁজদের পরিবারগুলোর উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

নরওয়ের বার্গেনে বসবাসকারী ২২ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী ভ্লাদিস্লাভা হোরলোভাও একই অপেক্ষায় আছেন। তাঁর মা ৪২ বছর বয়সী এলেনা আধ্যাত্মিক ভ্রমণে সীমান্ত এলাকায় গিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে আরও ৪৬ জন ইউক্রেনীয় নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

হোরলোভা জানিয়েছেন, তাঁর মাকে এখনো মৃত ঘোষণা করা হয়নি। তাই এই অবস্থাকেই তিনি আশার শেষ অবলম্বন হিসেবে ধরে রেখেছেন। মায়ের ফোনের অপেক্ষায় তিনি মোবাইলের রিংটোন সর্বোচ্চ শব্দে রেখে ঘুমাচ্ছেন। বন্যার একদিন পর মাকে পাঠানো তাঁর শেষ বার্তা—‘তুমি কি পৌঁছেছ?’—এখনো পড়া হয়নি।

অরুশির পরিবারও তাঁকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বন্যার তিন দিন পর অজয় গুপ্ত আরও তিন আত্মীয়কে নিয়ে কাঠমান্ডু যান। তাঁরা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে নিখোঁজ ও নিহতদের তালিকা খুঁজেছেন এবং দূতাবাস ও পুলিশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। পরিচয় শনাক্তকরণে সহায়তার জন্য ডিএনএ নমুনাও দিয়েছেন অজয়।

অন্যদিকে হোরলোভাও নেপাল, চীন, নরওয়ে ও ইউক্রেনের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, দূতাবাস ও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে যাচ্ছেন। প্রায় ৩০টি ই-মেইল পাঠানোর পাশাপাশি ফোনেও বহুবার যোগাযোগ করেছেন তিনি। নরওয়ে পুলিশের কাছেও ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন।

হোরলোভার মায়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত তথ্যও পরিবারকে কিছুটা আশার মধ্যে রেখেছে। তাঁর আইফোনের ‘ফাইন্ড মাই’ অ্যাপে সর্বশেষ অবস্থান চীনের অংশে দেখা গেলেও অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডের শেষ অবস্থান নেপালের অংশে দেখিয়েছে।

চীন ও নেপালের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের সন্ধান এবং তাঁদের পরিবারের কাছে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দিতে তারা কাজ করছে। ভারতও জানিয়েছে, তারা চীন ও নেপালের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

তবে উদ্ধারকাজের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ। কর্মকর্তাদের মতে, বন্যার পর উপত্যকাগুলোয় বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ জমেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের সন্ধান করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবু স্বজনদের অপেক্ষা থামেনি। অরুশির পরিবারের পক্ষ থেকে আবারও নেপাল যাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অজয় গুপ্ত এখনো বিশ্বাস করেন, কোনো এক অলৌকিক মুহূর্তে তাঁর মেয়ে ফিরে আসতে পারেন। সেই আশাতেই প্রতিদিন ফোন ও বার্তার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: