ওটিটিতে বদলে গেছে অভিনয়ের ধরন, বাড়ছে নতুন চরিত্রের সুযোগ

Pinky Saha Pinky Saha ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:২১ PM BST ২৮ বার পঠিত
ওটিটিতে বদলে গেছে অভিনয়ের ধরন, বাড়ছে নতুন চরিত্রের সুযোগ

ছবি: সংগৃহীত

গত কয়েক বছরে দেশের দর্শকদের বিনোদন দেখার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন এনেছে ওটিটি। করোনাকালে এর বিস্তার দ্রুত হলেও বর্তমানে এটি আর বিকল্প কোনো মাধ্যম নয়; সিনেমা ও টেলিভিশনের পাশাপাশি ওটিটি নিজস্ব দর্শক তৈরি করেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত মুক্তি পাচ্ছে ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজ। ‘মহানগর’, ‘তাকদীর’, ‘কারাগার’, ‘সিন্ডিকেট’ ও ‘কাইজার’-এর মতো কাজ দর্শকের আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি অভিনয়শিল্পীদেরও প্রচলিত ইমেজ ভেঙে নতুন চরিত্রে কাজের সুযোগ করে দিয়েছে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে ওটিটি ও সিনেমার অন্যতম বড় পার্থক্য ক্যামেরার ব্যবহারে। বড় পর্দায় অভিনেতার অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষা তুলনামূলক বড় ক্যানভাসে উপস্থাপিত হয়। অন্যদিকে ওটিটি কনটেন্ট দর্শকের বড় অংশ টেলিভিশন, ল্যাপটপ কিংবা মোবাইলের পর্দায় দেখেন। ফলে ক্যামেরা অনেক সময় অভিনেতার মুখের খুব কাছাকাছি থাকে। চোখের সামান্য নড়াচড়া, ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি কিংবা কয়েক মুহূর্তের নীরবতাও গল্প বলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

এই কারণে ওটিটিতে সংলাপের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। সিনেমায় অনেক সময় আবেগকে কণ্ঠের ওঠানামা, উচ্চারণ কিংবা সংলাপের মাধ্যমে স্পষ্ট করে প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু ওয়েব কনটেন্টে অতিরিক্ত প্রকাশভঙ্গি অনেক সময় কৃত্রিম মনে হতে পারে। কারণ দর্শক একটি চরিত্রকে দীর্ঘ সময় ধরে অনুসরণ করেন। ফলে সংলাপের পাশাপাশি চরিত্রের প্রতিক্রিয়া, থেমে যাওয়া ও নীরবতাও হয়ে ওঠে অভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

শরীরী ভাষার ক্ষেত্রেও পার্থক্যটি স্পষ্ট। সিনেমার একটি দৃশ্য নির্দিষ্ট মুহূর্তকে কেন্দ্র করে নির্মিত হলেও ওয়েব সিরিজে একটি চরিত্রকে কয়েকটি পর্বজুড়ে ধরে রাখতে হয়। তাই অতিরিক্ত অঙ্গভঙ্গি কিংবা মুখভঙ্গির বদলে চরিত্রের হাঁটা, বসা, তাকানো বা কথা বলার নিজস্ব ধরন চরিত্র নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ ওটিটির অভিনয়ে ‘কম করেও বেশি বলা’র দক্ষতা বিশেষভাবে প্রয়োজন।

চরিত্র নির্মাণের পরিসরেও ওটিটি এগিয়ে। দুই ঘণ্টার সিনেমায় একটি চরিত্রের জীবন, সংকট ও পরিবর্তনকে সীমিত সময়ের মধ্যে তুলে ধরতে হয়। কিন্তু ওয়েব সিরিজে চরিত্রের অতীত, সম্পর্ক, দুর্বলতা, অপরাধবোধ ও মানসিক পরিবর্তন বিস্তারিতভাবে দেখানোর সুযোগ থাকে। অভিনেতা মোশাররফ করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, ওটিটিতে চরিত্রকে গভীরভাবে অনুসন্ধানের সুযোগ বেশি এবং দর্শকরাও এখানে শক্তিশালী অভিনয় ও গল্প প্রত্যাশা করেন।

অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্বের অভিজ্ঞতাতেও ওটিটির এই পরিবর্তনের দিকটি উঠে এসেছে। তার মতে, শিল্পীদের জন্য ওটিটি অনেকটা ‘লাইফসেভার’ হয়ে এসেছে। তুলনামূলক বড় বাজেট, নতুন ধরনের গল্প এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্রে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে এ মাধ্যমে। আফরান নিশোও ওটিটিকে বাংলাদেশের বিনোদন শিল্পের জন্য ‘আশীর্বাদ’ হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, বড় বাজেটের গল্প ও ভিন্নধর্মী চরিত্রে কাজের সুযোগ এই মাধ্যমে তৈরি হয়েছে।

নির্মাতাদের কাছেও ওটিটি ও সিনেমার আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নির্মাতা অমিতাভ রেজা চৌধুরীর মতে, দুই মাধ্যমেরই নিজস্ব সুবিধা আছে এবং শেষ পর্যন্ত একটি গল্পই নির্ধারণ করে কাজটি কতটা সফল হবে। নির্মাতা আশফাক নিপুণও বিভিন্ন সময় ওটিটির প্রভাবে দেশের নির্মাণমান উন্নত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। ভিএফএক্স, কস্টিউম, পোস্টপ্রোডাকশন ও সাউন্ড ডিজাইনের মতো বিভাগগুলো এখন আগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে ওটিটির উত্থানে সিনেমার ক্ষতি হচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া কঠিন। একদিকে ঘরে বসেই ভালো গল্প ও অভিনয় দেখার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ওটিটি সিনেমার দর্শকের সময় ও মনোযোগের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। অন্যদিকে ওটিটির সাফল্য দর্শকের প্রত্যাশাও বাড়িয়েছে। এখন দর্শক গল্প, অভিনয় ও নির্মাণমান—সবকিছুতেই আগের চেয়ে বেশি সচেতন।

ফলে ওটিটি শুধু বিনোদনের নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নয়, অভিনয় ও নির্মাণের ভাষা বদলে দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর সঙ্গে সিনেমার প্রতিযোগিতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ভালো গল্প ও মানসম্মত নির্মাণের ক্ষেত্রে দুই মাধ্যমই একে অন্যকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: