ব্রেকিং

অপ্রতিম হত্যা: আইফোনের পাশাপাশি সামনে এলো ৫ হাজার টাকা ও ‘অসম বন্ধুত্বের’ তথ্য

Sharmin Sultana Sharmin Sultana ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৭ AM BST কুমিল্লা ৫২ বার পঠিত
অপ্রতিম হত্যা: আইফোনের পাশাপাশি সামনে এলো ৫ হাজার টাকা ও ‘অসম বন্ধুত্বের’ তথ্য

collected

কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে একটি আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল—শুরুতে পুলিশ এমন ধারণা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছিল। তবে তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কিছু বিষয় সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ, বয়সে বড়দের সঙ্গে অপ্রতিমের যোগাযোগ এবং টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলে তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার তথ্য।

তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত এখনো চলমান এবং এসব তথ্যের সবকিছু আদালতে প্রমাণিত নয়।

জেলা পুলিশ জানিয়েছে, অপ্রতিমের মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে তাকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ফোনটি নিতে বাধা দেওয়ায় বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হয় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

এ ঘটনায় অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার হত্যা মামলা করেন। মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের মধ্যে দুজন কিশোর। আরও একজন তরুণের সম্পৃক্ততা যাচাই করা হচ্ছে।

টিকটক ভিডিও তৈরির কথা বলে ডাকা হয়

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ঘটনার দিন শুক্রবার অপ্রতিমের মুঠোফোনে বারবার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন তুহিন। তাকে বাসা থেকে বের হয়ে আসতে বলা হয়। একপর্যায়ে অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোন দিয়ে টিকটকের জন্য ভিডিও ও ছবি তোলার কথা বলা হয়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোন নিয়ে শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বাসা থেকে বের হয়। এরপর সে আর বাড়িতে ফেরেনি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। পরে বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের চলাচলের দৃশ্য পাওয়া যায়। ফুটেজে তাদের পাশাপাশি হাঁটতে ও কথা বলতে দেখা যায়। একাধিক ফুটেজে তাদের সঙ্গে আরও দুজনকে দেখা গেছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়ার পর হামলা

অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। ঘটনাস্থলটি মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, সেখানে যাওয়ার পর আরও দুই কিশোর তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়। শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে আইফোনটি নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সে বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, এ সময় তুহিন বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন। পরে অন্যরাও তাকে আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তার মুঠোফোন নিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তবে মরদেহে পাওয়া সব আঘাতের প্রকৃতি ও মৃত্যুর সঙ্গে সেগুলোর সম্পর্ক নির্ধারণে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সামনে এসেছে পাঁচ হাজার টাকার বিরোধ

আইফোনের পাশাপাশি তদন্তে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের তথ্যও পেয়েছে পুলিশ।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ইয়েসটেকে কাজ করত গ্রেপ্তার হওয়া এক কিশোর। ওই কিশোরকে অপ্রতিম পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল বলে তদন্তে জানা গেছে। সম্প্রতি অপ্রতিম ওই টাকা ফেরত চাইছিল।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, টাকা ফেরত চাওয়ায় ওই কিশোর অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল। এমনকি অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন চিন্তা তার মধ্যে কাজ করেছিল কি না, সেটিও তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একটি ফোনকল থেকে তদন্তে নতুন মোড়

তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায় তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময়। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, শনিবার সকালে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়া হয়। তখনো তদন্তকারীরা অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাননি।

পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশ বলছে, শুরুতে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন। পরে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় তুহিনের মুঠোফোনে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ওই কিশোরের ফোন আসে। বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। পরে ওই কিশোরকে হেফাজতে নেওয়া হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরেক কিশোরকে হেফাজতে নেওয়া হয় বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে।

অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যার পর অপ্রতিমের আইফোনটি তুহিনের কাছে ছিল। পরে ফোনটি তাঁর বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, শনিবার রাতে পুলিশ তুহিনের সানন্দার বাড়িতে গেলে তাঁর মা বিছানার তোশকের নিচ থেকে আইফোনটি বের করে দেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তুহিন ঘটনার দিন সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে ফিরেছিলেন।

আইফোনটি উদ্ধারের বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করছে পুলিশ।

‘অসম বন্ধুত্ব’ নিয়ে তদন্ত

অপ্রতিম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্কুল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, সে শান্ত, মিশুক এবং পড়াশোনায় ভালো ছিল।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অপ্রতিমের সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সম্পর্ককে ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। কারণ, তাদের বয়স অপ্রতিমের চেয়ে বেশি এবং তারা তার সহপাঠী ছিল না।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, অপ্রতিমের সঙ্গে তাদের একসঙ্গে চলাফেরা, ছবি তোলা এবং টিকটক ভিডিও তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এই সম্পর্কের প্রকৃতি এবং হত্যাকাণ্ডে কার কী ভূমিকা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আগে কোনো পুলিশ রেকর্ড ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হয়েছে। কিশোর অপরাধচক্রের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।

নিজের ফোন না নেওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ

তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, ঘটনার দিন অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ১৫ বছর বয়সী ওই কিশোর নিজের মুঠোফোন সঙ্গে নেয়নি। পরিবারের অন্য একজনের ফোন নিয়ে সে বাইরে বের হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তদন্তকারীদের ধারণা, নিজের ফোনের অবস্থান শনাক্ত হওয়া এড়াতে এমনটি করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে প্রযুক্তিগত আলামতসহ অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

ওই কিশোরের বাবাকে ঘটনার পর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে তাঁর অনুপস্থিতির সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

তদন্ত এখনো চলমান

অপ্রতিমের মরদেহ শনিবার লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ পাঠানো হয়। পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা, হত্যার সুনির্দিষ্ট কারণ এবং ঘটনাটির পেছনে অন্য কোনো ব্যক্তি বা উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে।

আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিরোধ, টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভন এবং বয়সে বড়দের সঙ্গে অপ্রতিমের যোগাযোগ—তদন্তে উঠে আসা এসব তথ্যের মধ্যে কোনগুলো হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, তা তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হবে।

অপ্রতিমের মৃত্যুতে পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের সৃষ্টি হয়েছে। রোববার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে তার প্রথম জানাজা এবং পরে গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

বিজ্ঞাপন / ADVERTISEMENT Youth Soft-Tech International Ltd.
শেয়ার করুন: