জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নেমে আর্জেন্টিনাকে দিয়েছেন গোল ও অ্যাসিস্ট। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে হাজারো মানুষের ‘মেসি... মেসি...’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে শেষ হলো লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়ের এক আবেগঘন অধ্যায়।
হাজারো মানুষের গর্জনে কেঁপে উঠেছিল মনুমেন্তাল স্টেডিয়াম। চারপাশে একটাই ধ্বনি—‘মেসি... মেসি... মেসি...’। এটি যেন কোনো সাধারণ স্লোগান ছিল না; বরং প্রিয় নায়কের বিদায়ক্ষণে মানুষের আবেগমিশ্রিত প্রার্থনা। জাতীয় দলের জার্সিতে শেষবারের মতো মাঠে নামা লিওনেল মেসিকে শেষবারের মতো অভিবাদন জানাতে সেদিন এক হয়ে গিয়েছিল পুরো আর্জেন্টিনা।
মেসিকে ছাড়া আর্জেন্টিনার কথা ভাবতে অভ্যস্ত নয় দেশটির একটি প্রজন্ম। ২১ বছর ধরে জাতীয় দলের সঙ্গে থাকা এই মহাতারকা কারও শৈশব, কারও কৈশোর কিংবা পুরো ফুটবল-জীবনের অংশ। রাজনৈতিক মত, সামাজিক বিভাজন কিংবা ফুটবল নিয়ে ভিন্নতা—সবকিছু কয়েক ঘণ্টার জন্য ভুলে গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সবার সামনে তখন শুধু একজন—লিওনেল মেসি।
স্টেডিয়ামে ঢোকার আগেই আবেগে কাঁদছিলেন মেসি। বাসের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে যেন ফিরে যাচ্ছিলেন জাতীয় দলের জার্সিতে কাটানো দুই দশকের স্মৃতিতে। বারবার চোখের পানি মুছছিলেন তিনি। মনুমেন্তালে পৌঁছে আবেগ আরও বেড়ে যায়। সাজানো ড্রেসিংরুম, স্মৃতিময় পরিবেশ এবং প্রিয়জনদের উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়ে বিদায়ের মুহূর্ত আরও ভারী হয়ে ওঠে।
ওয়ার্মআপে মাঠে নামার সময় গ্যালারি যখন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে মেসিকে অভিবাদন জানায়, তখন আর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি তিনি। চারদিকে হাত তুলে সমর্থকদের শেষবারের মতো অভিবাদন জানান।
মাঠে প্রবেশের পর আকাশের দিকে তাকান মেসি। পাশে ছিলেন তাঁর তিন ছেলে। জাতীয় সংগীত বাজলেও এবার কণ্ঠ মেলাতে পারেননি তিনি। গলায় আটকে ছিল আবেগ। সেই মুহূর্তে হয়তো ফিরে গিয়েছিলেন ছোট্ট লিওর দিনগুলোতে—দাদি সেলিয়ার হাত ধরে মাঠে যাওয়ার স্মৃতিতে।
ফুটবলের প্রতি মেসির ভালোবাসার শিকড় সেই শৈশবেই। দাদি সেলিয়া ছিলেন তাঁর বড় অনুপ্রেরণা। ছোট্ট লিওকে মাঠে নামানোর জন্য কোচের সঙ্গে তর্ক করতেও পিছপা হতেন না তিনি। সেই দাদির স্মৃতিই আজও মেসির জীবনে বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
বিদায়ী ম্যাচেও অবশ্য আবেগের পাশাপাশি নিজের ফুটবলটাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন মেসি। শুরুতে ছন্দ খুঁজে পেতে কিছুটা সময় লাগলেও দ্বিতীয়ার্ধে বদলে দেন ম্যাচের চিত্র। নিকোলাস ওতামেন্দির গোলে অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন। পরে নিকো পাজের গোলের সুযোগ তৈরিতেও রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি থেকে নিজেই করেন গোল।
আর্জেন্টিনা জেতে ৩-০ গোলে। জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির গোলসংখ্যা পৌঁছে যায় ১২৬-এ। সতীর্থরা তাঁকে ঘিরে উদযাপন করেন। মুহূর্তটি ছিল যেন জন্মদিনের কেক ঘিরে থাকা আপনজনদের মতো—মাঝখানে মেসি, চারপাশে তাঁর প্রিয় সতীর্থরা।
ছোটবেলায় মেসির চাওয়া ছিল খুব সাধারণ—তিনি শুধু ফুটবল খেলতে চেয়েছিলেন। গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি, নানা প্রতিকূলতা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে সেই ছোট্ট ছেলেটিই আজ ৩৯ বছরের বাবা, আন্তোনেলার স্বামী এবং বিশ্বের কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা।
যাঁরা একসময় দূর থেকে তাঁকে দেখেছেন, তাঁরাই পরে হয়েছেন সতীর্থ। তরুণেরা তাঁকে দেখেই স্বপ্ন দেখতে শিখেছেন। মেসির পাশে দাঁড়িয়ে খেলেছেন ওতামেন্দি, দি পল, দি মারিয়ারা; তাঁর কাছ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, রোমেরো, মার্তিনেজদের মতো প্রজন্ম।
মেসির বিদায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের বিদায় নয়। এটি একটি প্রজন্মের স্মৃতির সমাপ্তি। মনুমেন্তালে সেই রাতে কান্না, ভালোবাসা আর ‘মেসি... মেসি...’ ধ্বনিতে আর্জেন্টিনা যেন জানিয়ে দিল—মেসি জাতীয় দল থেকে বিদায় নিতে পারেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার হৃদয় থেকে কখনোই নয়।