Collected
কোনো মুসলমানকে তার গুনাহের কারণে নিশ্চিতভাবে ‘জাহান্নামি’ বলে ঘোষণা করা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। ইসলাম অন্যায় ও পাপকে পাপ হিসেবে চিহ্নিত করতে এবং মানুষকে গুনাহ থেকে সতর্ক করতে উৎসাহিত করেছে। তবে ওহির সুস্পষ্ট দলিল ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির চূড়ান্ত আখিরাতের পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া অনুচিত।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, জান্নাত ও জাহান্নামের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর হাতে। মানুষের প্রকাশ্য আমল দেখে তার শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কারণ একজন মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায় কীভাবে শেষ হবে, তা মানুষের অজানা।
কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় তোমার রবই সবচেয়ে ভালো জানেন, কে তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং কে সৎপথপ্রাপ্ত।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১১৭)
বিশেষ করে কোনো মুসলমান কবিরা গুনাহে জড়িয়ে পড়লেই তাকে নিশ্চিত জাহান্নামি বলা যাবে না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা অনুযায়ী, শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহ নিয়ে কেউ আল্লাহর কাছে উপস্থিত হলে তার ব্যাপার আল্লাহর ইচ্ছাধীন। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন, আবার চাইলে তার অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দিতে পারেন।
কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না, এটা ছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো কাজকে হারাম বা গুনাহ বলা এবং নির্দিষ্ট একজন মানুষকে ‘জাহান্নামি’ বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া এক বিষয় নয়। মদ্যপান, সুদ, ঘুষ, জুলুম, ব্যভিচারসহ নিষিদ্ধ কাজের বিরুদ্ধে সতর্ক করা ইসলামের নির্দেশনার অংশ। কিন্তু কোনো ব্যক্তির শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই।
এ বিষয়ে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিস বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। বনি ইসরাইলের দুই ব্যক্তির একজন ছিলেন গুনাহগার এবং অন্যজন ছিলেন অধিক ইবাদতকারী। ইবাদতকারী ব্যক্তি বারবার তার সঙ্গীকে গুনাহ থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিতেন। একপর্যায়ে তিনি বলে ফেলেন, ‘আল্লাহর কসম, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না।’ তখন আল্লাহ তার ওই বক্তব্যের নিন্দা করে গুনাহগার ব্যক্তিকে ক্ষমা করেন এবং অহংকারী ইবাদতকারীর আমল নষ্ট করে দেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২১)
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, অন্যের আখিরাত সম্পর্কে নিজের ধারণার ভিত্তিতে চূড়ান্ত রায় দেওয়া কতটা বিপজ্জনক।
অন্যদিকে, গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির জন্য তওবার দরজা খোলা রয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজেদের ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ! তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৫৩)
তাই কোনো পাপী মানুষকে সংশোধনের আহ্বান জানানো যেমন জরুরি, তেমনি তাকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না করাও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ কখন তওবা করে ফিরে আসবে, তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়।
তবে কোরআন বা নির্ভরযোগ্য হাদিসে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে জান্নাত বা জাহান্নামের সুস্পষ্ট সংবাদ থাকলে সেই ওহিভিত্তিক ঘোষণা বর্ণনা করা যায়। যেমন আবু লাহাব সম্পর্কে কোরআনে তার পরিণতি সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা এসেছে।
সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিতে পাপকে পাপ বলা, মানুষকে গুনাহ থেকে সতর্ক করা এবং তওবার পথে আহ্বান করা উচিত। কিন্তু ওহির সুস্পষ্ট দলিল ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট মুসলমানকে ‘নিশ্চিত জাহান্নামি’ বলে চূড়ান্ত রায় দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। কারণ মানুষের বাহ্যিক অবস্থা নয়, তার অন্তর, তওবা এবং জীবনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে।