Internet
১. জন্ম ও শৈশবকাল
আনুমানিক ৫৬৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হিমালয়ের পাদদেশে বর্তমান নেপালের লুম্বিনী কাননে এক রাজপরিবারে সিদ্ধার্থের জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন শাক্য বংশের রাজা শুদ্ধোধন এবং মাতা রানী মায়া দেবী। সিদ্ধার্থের জন্মের মাত্র সাত দিন পরেই তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। এরপর বিমাতা গৌতমী তাঁকে লালন-পালন করেন, তাই তাঁর নাম হয় 'গৌতম'।
সিদ্ধার্থের জন্মের পর এক জ্যোতিষী ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে—এই বালক হয় এক বিশাল সাম্রাজ্যের রাজা হবে, নয়তো সংসার ত্যাগ করে এক মহান আধ্যাত্মিক গুরু হবে। রাজা শুদ্ধোধন তাঁর পুত্রকে সন্ন্যাসী হতে দিতে চাননি। তাই তিনি সিদ্ধার্থকে বাইরের দুঃখ-কষ্ট থেকে আড়ালে রেখে রাজপ্রাসাদের বিলাসবহুল জীবনের মধ্যে বড় করে তোলেন।
২. বৈবাহিক জীবন ও চারটি দৃশ্য
যুবক বয়সে পৌঁছালে সিদ্ধার্থকে সুন্দরী রাজকন্যা যশোধরার সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। তাঁদের ঘরে রাহুল নামে একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। রাজা শুদ্ধোধন ভেবেছিলেন সন্তান ও স্ত্রীর মায়ায় সিদ্ধার্থ চিরকাল রাজপ্রাসাদেই থেকে যাবেন।
কিন্তু একদিন সিদ্ধার্থ তাঁর সারথি ছন্দককে নিয়ে নগর ভ্রমণে বের হন। প্রাসাদের বাইরে গিয়ে তিনি জীবনের এমন চারটি দৃশ্য দেখেন, যা তাঁর মনের পুরো জগত ওলট-পালট করে দেয়:
- একটি জরাজীর্ণ ও অতি বৃদ্ধ মানুষ।
- একটি অসুস্থ ব্যক্তি যে ব্যথায় ছটফট করছে।
- একটি মৃতদেহ, যাকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
- একজন শান্ত ও সৌম্য চেহারার সন্ন্যাসী।
প্রথম তিনটি দৃশ্য দেখে সিদ্ধার্থ বুঝতে পারেন যে মানুষের জীবন দুঃখময় এবং বার্ধক্য, রোগ ও মৃত্যু থেকে কারোরই মুক্তি নেই। আর চতুর্থ দৃশ্যটি (সন্ন্যাসী) তাঁকে শান্তি ও মুক্তির পথ দেখায়।
৩. মহাভিনিষ্ক্রমণ বা গৃহত্যাগ
মানুষের জীবনের এই পরম দুঃখ থেকে মুক্তির উপায় খোঁজার জন্য সিদ্ধার্থ ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। অবশেষে এক গভীর রাতে ২৯ বছর বয়সে তিনি তাঁর ঘুমন্ত স্ত্রী ও পুত্রকে রেখে, রাজপ্রাসাদের সমস্ত বিলাসিতা ত্যাগ করে রাজপথের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। বৌদ্ধ ইতিহাসে এই ঘটনাকে 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' বলা হয়।
৪. কঠোর সাধনা ও বুদ্ধত্ব লাভ
সিদ্ধার্থ বছরের পর বছর বনের মধ্যে ঘুরে বেড়ালেন, বিভিন্ন গুরুর কাছে শিক্ষা নিলেন এবং কঠোর উপবাস করে সাধনা করলেন। কিন্তু এতে তিনি প্রকৃত সত্য খুঁজে পেলেন না। তিনি বুঝতে পারলেন শরীরকে কষ্ট দিয়ে জ্ঞান লাভ সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন মধ্যপন্থা (Middle Path)।
অবশেষে, বিহারের গয়ার এক পিপল গাছের (যা পরে বোধিবৃক্ষ নামে পরিচিত হয়) নিচে তিনি গভীর ধ্যানে বসেন। দীর্ঘ সাধনার পর ৩৫ বছর বয়সে তিনি পরম জ্ঞান বা 'নির্বাণ' লাভ করেন। পরম জ্ঞান লাভ করার পর সিদ্ধার্থ হয়ে ওঠেন 'বুদ্ধ', যার অর্থ "জাগ্রত বা আলোকিত ব্যক্তি"।
৫. ধর্ম প্রচার ও মহাপরিনির্বাণ
জ্ঞান লাভের পর বুদ্ধ তাঁর প্রথম পাঁচজন শিষ্যের কাছে সারনাথের মৃগদাবে তাঁর বাণী প্রচার করেন। তিনি মানুষকে অহিংসা, দয়া, এবং মনের পবিত্রতার শিক্ষা দেন। তিনি বলেছিলেন—লোভ ও আসক্তিই হলো মানুষের সব দুঃখের মূল কারণ, আর একে জয় করাই হলো আসল মুক্তি। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে তিনি তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন।
অবশেষে, ৮০ বছর বয়সে উত্তরপ্রদেশের কুশীনগরে এই মহান আধ্যাত্মিক গুরু দেহত্যাগ করেন। বৌদ্ধ ধর্মে তাঁর এই শেষ বিদায়কে 'মহাপরিনির্বাণ' বলা হয়।